গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তে অনুষ্ঠিত নীতি সংলাপে রাষ্ট্রের দুর্নীতি ও হয়রানি প্রক্রিয়াগত রূপ ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমাতে এবং কাঠামোগত অদক্ষতা দূর করতে তৎপরতা প্রয়োজন। বর্তমান সরকারী কাঠামোর মধ্যে আর্থিক সংকট, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্ষমতাবানদের অহমিকা প্রদর্শনের প্রকল্পকে প্রধান সমস্যারূপে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মিন্টো রোডে সরকারি কর্মচারীদের ফ্ল্যাটের বিলাসবহুল সুবিধা নিয়ে আলোচনা করা হলে, তিনি বলেন, এসব সম্পত্তি হোটেলকে হার মানাতে পারে এমন মানের, তবে এ ধরনের ব্যয়ের জন্য কোনো জবাবদিহি প্রক্রিয়া নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সঠিক না হলে দেশের উন্নয়ন থেমে যাবে।
সংলাপটি ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক নীতি সংলাপের অংশ হিসেবে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজন করে। সিজিএসের সভাপতি ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) এর নির্বাহী পরিচালক এম. আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা, বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন সংলাপে বলেন, “ভালো মানুষ রাজনীতিতে না এলে সংসদে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।” তার বক্তব্যে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও নাগরিকের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা যুক্তি দেন, “দেশে নীতিমালার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি প্রকট।” তিনি নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক পূরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানান।
র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম. আবু ইউসুফ বলেন, “রাজনীতি থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করা না গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।” তার মন্তব্যে শাসনব্যবস্থার স্বতন্ত্রতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হয়েছে।
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র, সংলাপে শহুরে উন্নয়ন ও দুর্নীতির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে জাতীয় স্তরে সমস্যার সমাধান কঠিন।
শাহেদুল ইসলাম হেলাল, বিসিআইর সাবেক সভাপতি, শিল্পক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারি ব্যয়ের অযৌক্তিকতা ও দুর্নীতির প্রভাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিল্পের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের জন্য স্বচ্ছ আর্থিক নীতি অপরিহার্য।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়নই মূল চাবিকাঠি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আর্থিক সংকটের সমাধান না হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।
সংলাপের শেষে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে দুর্নীতি ও হয়রানি নিয়ন্ত্রণে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এ ধরনের নীতি সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সমস্যার সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই আলোচনার পর, পিপিআরসি এবং সিজিএস উভয়ই দুর্নীতি মোকাবেলায় গবেষণা ও নীতি প্রণয়নের কাজ ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা উল্লেখ করে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের বক্তব্য ও সংলাপের আলোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রের দুর্নীতি ও হয়রানি এখনো কাঠামোগত সমস্যার মুখে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব হ্রাস, আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং নীতি বাস্তবায়নের ত্বরান্বিতিকরণই দেশের সুশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি।



