সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকি বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ৮:৫০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পায়েরা চত্বরে অনুষ্ঠিত পাঁচ দিনের “শহীদ ওসমান হাদি বই মেলা”-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রো‑লিবারেশন ও অ্যান্টি‑লিবারেশন শব্দগুচ্ছের দীর্ঘদিনের ব্যবহারকে পুনরায় মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ফারুকি বলেন, “প্রো‑লিবারেশন ও অ্যান্টি‑লিবারেশন শব্দগুচ্ছ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন এই দ্বৈতধারাকে পুনরায় বিবেচনা করার সময় এসেছে।” তিনি এ কথায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ‘লিবারেশন বিরোধী’ হিসেবে কে গণ্য করা হয় তা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন।
তার মতে, লিবারেশন বিরোধী শক্তি হল সেই গোষ্ঠী যারা গত পনেরো বছর ধরে দেশের সার্বভৌমত্বকে আপসের পথে নিয়ে গেছেন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। “যারা আমাদের সার্বভৌমত্বকে আপসের পথে নিয়ে গেছেন, যারা নির্বাচনের ব্যবস্থা দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, তারা লিবারেশন বিরোধী,” ফারুকি যুক্তি দেন।
পূর্ববর্তী সরকারের ক্ষেত্রে বিদেশি হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের শাসন ও মন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্তগুলো বিদেশ থেকে নেওয়া হচ্ছিল। “আপনি যখন আপনার দেশের সব সিদ্ধান্ত অন্য কোনো স্থানে হস্তান্তর করে, তারপর নিজেকে প্রো‑লিবারেশন বলার সাহস করেন, তখন এর চেয়ে বড় ব্যঙ্গ আর কিছু হতে পারে না,” তিনি মন্তব্য করেন।
ফারুকি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এমন একটি সাংস্কৃতিক স্থান গড়ে তোলার প্রয়োজন যা ভবিষ্যতে ফ্যাসিজমের কোনো সুযোগ না রাখে। তিনি বলছেন, আওয়ামী লীগের ষোলো বছরের শাসনকালে সংস্কৃতিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একটি ‘উচ্চ সংস্কৃতি’ ও ‘নিম্ন সংস্কৃতি’ গঠন করা হয়েছিল।
এই সংস্কৃতি-নির্মাণের মূল ধারণা হল, বাংলা সংস্কৃতিকে আওয়ামী সংস্কৃতি ও হেজিমিক রাজনীতির সঙ্গে সমান করে দেখা, যা উচ্চ সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়। “এমন একটি বর্ণনা তৈরি হয়েছে যে, যাকে উচ্চ সংস্কৃতি বলা হয়, সেটাই আসলে আওয়ামী সংস্কৃতি ও হেজিমিক রাজনীতি,” ফারুকি ব্যাখ্যা করেন।
উচ্চ ও নিম্ন সংস্কৃতির পার্থক্যকে তিনি মৃত্যুর মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেন। “এই ধারণা নির্ধারণ করে কার মৃত্যুকে শোক করা উচিত এবং কারকে নয়,” তিনি বলেন। উদাহরণস্বরূপ, ব্যারিস্টার আরমানের জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়ার সময় মধ্যবিত্ত সমাজের শোকের অভাবকে তিনি ‘প্রগতিশীল’ সংবাদপত্রের শিক্ষার ফল বলে উল্লেখ করেন।
ফারুকি এই বক্তব্যের মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনায় বিদ্যমান দ্বৈতধারার কাঠামোকে ভেঙে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই পুনর্বিবেচনা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত যখন রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের বিষয়গুলোকে ভোটের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন সাহিত্যিক, প্রকাশক ও ছাত্র সমাজের সদস্যরা ফারুকির মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে, দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আরও সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
ফারুকির এই মন্তব্যের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, তিনি সাংস্কৃতিক নীতি গঠনে স্বতন্ত্র স্থান তৈরি, বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবনা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে।



