বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এর বার্ষিক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডাভোসে একটি ভাষণ উপস্থাপন করেন এবং সেখানেই তিনি স্বৈরশাসকের ভূমিকা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ডাভোসে তার বক্তৃতার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি উল্লেখ করেন, “শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কখনো কখনো স্বৈরশাসকের প্রয়োজন হয়।” এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে “স্বৈরশাসক” বলে অভিহিত করেন এবং এ বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক মতবাদের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং “সাধারণ বুদ্ধি”র প্রশ্ন বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের মতে, তার ডাভোসে বক্তৃতা ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে এবং তিনি “ভালো একটি বক্তৃতা দিয়েছি, অসাধারণ প্রতিক্রিয়া পেয়েছি” বলে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি যোগ করেন, “অনেকেই আমাকে ভয়ংকর স্বৈরশাসক বলে ডাকে, কিন্তু আমি স্বৈরশাসকই। কখনো কখনো স্বৈরশাসক দরকার।” এই মন্তব্যের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি পুনরায় তুলে ধরেন এবং কানাডা ও ইউরোপের প্রতি হুমকিস্বরূপ বক্তব্য দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও বিদ্রূপের জন্ম দেয়।
ট্রাম্পের স্বৈরশাসকের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা নতুন নয়। আগস্ট ২০২৫-এ ওয়াশিংটনে তিনি অপরাধ ও অবৈধ অভিবাসন দমন করার জন্য ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন এবং পতাকা পোড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করার সময় উল্লেখ করেন, “অনেক আমেরিকানই স্বৈরশাসক চান।” তিনি আরও বলেন, “তারা বলে- আমাদের তাকে দরকার নেই, স্বাধীনতা চাই। সে স্বৈরশাসক।” যদিও পরে তিনি দাবি করেন, “আমি স্বৈরশাসক নই, আমি শুধু সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ।”
২০২৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রথম দফা থেকেই “স্বৈরশাসকের মতো” কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যা আবারো তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত করে। তার এই ধারাবাহিক মন্তব্য এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃত্ববাদী নেতাদের প্রশংসা করার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ট্রাম্প পূর্বে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে “খুব বুদ্ধিমান” এবং “শক্তিশালী নেতা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণকে “চতুর” ও “জিনিয়াস” সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকেও ট্রাম্প “শক্তিশালী” এবং “অত্যন্ত সম্মানিত” নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ধরনের মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার স্বৈরশাসক মন্তব্যের সঙ্গে তুলনীয়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যেখানে সমালোচকরা যুক্তি দেন যে তিনি গণতান্ত্রিক নীতির পরিবর্তে ব্যক্তিগত ক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ডাভোসে অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বক্তব্যের পর সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপক বিতর্ক গড়ে ওঠে। অনেক ব্যবহারকারী তার স্বৈরশাসক স্বীকৃতিকে অগ্রহণযোগ্য বলে সমালোচনা করেন, আবার কিছু সমর্থক তাকে কঠিন সময়ে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের রেটোরিকের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড, কানাডা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ প্রভাবের দিকে দৃষ্টি দেন। যদি ট্রাম্পের স্বৈরশাসক মন্তব্যগুলো নির্বাচনের আগে আরও বাড়ে, তবে তা তার সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে বিভাজন বাড়াতে পারে এবং ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক ধ্রুবকতা হ্রাস করতে পারে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট পার্টি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই রকম রেটোরিককে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরতে পারে, যা ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্বিবেচনার দিকে নিয়ে যাবে।
সামগ্রিকভাবে, ডাভোসে ট্রাম্পের স্বৈরশাসক মন্তব্য এবং তার পূর্বের সমজাতীয় রেটোরিকের ধারাবাহিকতা তাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিতর্কের কেন্দ্রে রাখে। তার বক্তব্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি, বিশেষ করে নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো কী হবে, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হবে।



