পূর্বাচল অবস্থিত বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার একটি সেমিনারে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন রপ্তানি নীতির নতুন দিকনির্দেশনা উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, রপ্তানি খাতকে কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী পণ্য ও সেবা ভিত্তিক করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে।
উপদেষ্টা জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে রপ্তানি আয়কে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ (Export Competitiveness for Jobs) প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাপক সংস্কার ও বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল রপ্তানি পণ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন খরচ কমানো এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রকল্পের তহবিলের বড় অংশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত। এতে চামড়া, পাদুকা, হালকা প্রকৌশল এবং প্লাস্টিক শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই সেক্টরগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ কর্মশক্তি দিয়ে সমৃদ্ধ করে রপ্তানি পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনা হবে বলে পরিকল্পনা।
শেখ বশিরউদ্দীন উল্লেখ করেন, পূর্বে রপ্তানি নীতি মূলত ব্যয়ভিত্তিক পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তবে এখন বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরামর্শ ও বিতর্কের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণে অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো হয়েছে, যাতে বাজারের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
গ্লোবাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনা করে সরকার দেশের অবস্থান নির্ধারণে সক্রিয়। এদিকে, রপ্তানি পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং লজিস্টিক্স অবকাঠামো শক্তিশালীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে সহায়তা করবে।
সেমিনারে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুর রহিম খানও বক্তব্য রাখেন। তারা উল্লেখ করেন, প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে চলবে এবং প্রথম পর্যায়ে লক্ষ্যবস্তু শিল্পগুলোতে প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন, গবেষণা ও উন্নয়ন সুবিধা প্রদান এবং রপ্তানি বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা।
প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক মেশিনারি, ডিজিটাল ডিজাইন সফটওয়্যার এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবের ব্যবস্থা করা হবে। এসব সুবিধা শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে এবং পণ্যের মানোন্নয়নে সহায়তা করবে। ফলে রপ্তানি পণ্যের মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্য অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
প্রকল্পের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজে রপ্তানি ঋণ, বীমা সুবিধা এবং করছাড়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। এই আর্থিক প্রণোদনা ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (SMEs) কে রপ্তানি কার্যক্রমে প্রবেশের বাধা কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চামড়া ও পাদুকা শিল্পে বহু ক্ষুদ্র উৎপাদনকারী এই সুবিধা থেকে উপকৃত হবে।
সেমিনারে আলোচনায় ইপিবি (ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কস অ্যান্ড বিজনেস) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা রপ্তানি খাতের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা প্রস্তাব করেন।
লাইট ক্যাসেল পার্টনার্সের সিইও বিজন ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি রপ্তানি শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ বিশ্লেষণ করে বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন, কাঁচামালের দাম ওঠানামা এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের কঠোরতা রপ্তানি ব্যবসায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার এবং কার্বন নির্গমন কমানোর প্রযুক্তি গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবেশগত শর্ত পূরণ করে রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, রপ্তানি খাতকে বহুমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে সরকার ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্পের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক প্রণোদনা এবং প্রযুক্তি সহায়তা চালু করেছে। চামড়া, পাদুকা, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিক শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করা হবে। এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন রপ্তানি আয়কে ২০৩০ সালে ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে নিয়ে যাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।



