সকালবেলা পল্টন থানায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশকে জানানো হয়। ঘটনাস্থলে শিশুর বাবা, মা ও দাদী একসঙ্গে উপস্থিত হন এবং ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ দেন।
পুলিশের সঙ্গে কথা বলার পর, শিশুর মা আইনি পদক্ষেপ নিতে সিদ্ধান্ত নেন এবং শিশু আইন ১৯৯১-এর ধারা ৭০ অনুযায়ী দুইজনকে অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করেন। ধারা ৭০-এ নির্ধারিত হয়েছে যে, হেফাজতে থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা বা অশালীনভাবে ব্যবহার করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লক্ষ টাকার জরিমানা আরোপ করা যায়।
স্কুলের সামনে উপস্থিত অভিভাবকগণও এই ঘটনার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করেন। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধের জন্য কঠোর পদক্ষেপের দাবি করেন।
একজন অভিভাবক, যিনি নাম প্রকাশ না করে কথা বলেছেন, জানান তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে আগে জানতেন না। তিনি শিশুটিকে নিয়ে স্কুলে গিয়ে শোনার পর অবাক হয়ে যান এবং বললেন, “আমি প্রায়ই দেরিতে সন্তানকে নিতে আসি, কিন্তু এখন আর স্কুলে ছেড়ে দিতে পারব না।” তিনি ভবিষ্যতে শিশুকে স্কুলে পাঠাতে দ্বিধা প্রকাশ করেন।
শিশু শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারণা চালিয়ে আসা গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ টু এন্ড অল কর্পোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন (GI) ২০০১ সাল থেকে কাজ করে আসছে। ২০২০ সালে এই উদ্যোগের নাম পরিবর্তন করে “এন্ড কর্পোরাল পানিশমেন্ট” করা হয়। ২০২৪ সালের আপডেটেড রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে স্কুলে শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে নীতিমালা আইনগত রূপে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন।
রিপোর্টে আরও জানানো হয়েছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বাড়ি, দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং অন্যান্য যত্নশীল প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি এখনও নিষিদ্ধ নয়। এই ফাঁক পূরণে আইন প্রণয়নের ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঢাকা শহরের শিশু নির্যাতন সম্পর্কিত গবেষণা, যা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) ২০২৩ সালে প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় পরিবারে ৫৮ শতাংশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ এবং খেলার মাঠে ৬৫ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গবেষণাটি ২০১৯ সালে মিরপুরের উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়।
এই গবেষণার ফলাফল স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে এবং তা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।
পল্টন থানায় তদন্তকারী পুলিশ দল এখনো ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করছে। শিশুর শারীরিক অবস্থা, সাক্ষী বিবরণ এবং চিকিৎসা রেকর্ড যাচাই করা হচ্ছে। মামলাটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হবে বলে জানা গেছে।
মামলার আইনি দিক থেকে, ধারা ৭০ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লক্ষ টাকার জরিমানা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি নির্ধারিত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই ঘটনার পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং স্কুলে শারীরিক শাস্তি বন্ধ করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কথা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য সচেতনতা কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিশু অধিকার সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই মামলাকে ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা দাবি করে যে, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা এবং শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা জরুরি।
এই ঘটনার পর, স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিশুর প্রতি সহিংসতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



