শিশুদের শারীরিক শাস্তি এখনও দেশের বিভিন্ন পরিবেশে ব্যাপকভাবে ঘটছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, বাড়ি, স্কুল এবং খেলার মাঠে শারীরিক নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি শিশু স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে এবং সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ টু এন্ড অল কর্পোরাল প্যানিশমেন্ট অব চিলড্রেন (GI) ২০০১ সালে শিশু শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চালু করে এবং ২০২০ সালে “এন্ড কর্পোরাল প্যানিশমেন্ট” নামে পুনঃব্র্যান্ড করে। ২০২৪ সালের আপডেটেড প্রতিবেদনে বাংলাদেশে স্কুলে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার জন্য আইনগত কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে, তবে বাড়ি, দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং অন্যান্য যত্নস্থানে এখনও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস) ২০২৩ সালে “ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট চিলড্রেন অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাক্টরস ইন আরবান এরিয়া অব ঢাকা, বাংলাদেশ” শিরোনামের গবেষণা প্রকাশ করে। এই গবেষণাটি ২০১৯ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মিরপুরের দুটি ওয়ার্ডে পরিচালিত হয় এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ১০ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৪০১ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করে। গবেষণার লক্ষ্য ছিল শহুরে পরিবেশে শিশুর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতি ও তার সঙ্গে যুক্ত সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বাড়িতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার শিশুর হার ৫৮ শতাংশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ এবং খেলার মাঠে ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, প্রতিটি পাঁচ থেকে ছয় শিশুরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো না কোনো রূপে শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। এই সংখ্যা বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারে বেশি, যেখানে আর্থিক ও সামাজিক চাপের কারণে শাস্তি প্রয়োগের প্রবণতা বাড়ে।
শারীরিক শাস্তি কেবল শারীরিক ক্ষতি নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক নির্যাতনের শিকার শিশুরা আত্মবিশ্বাসের অভাব, উদ্বেগ, এবং দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতার ঝুঁকিতে থাকে। বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই ধরনের ট্রমা স্নায়ু-শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, যা শিক্ষাগত অর্জন ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে, পুরো সমাজের মানবসম্পদে ক্ষতি হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।
বিইউএইচএসের জনস্বাস্থ্য অনুষদের ডিন ও প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক বেগম রওশন আরা উল্লেখ করেন, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা জরুরি, নইলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হবে এবং সমাজের সামগ্রিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শাস্তি প্রয়োগকারীদের আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে উদাহরণ স্থাপন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ হ্রাস পায়।
এই প্রেক্ষাপটে নীতি নির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং অভিভাবকদের সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করার আইনকে বাড়ি ও যত্নস্থলসহ সকল পরিবেশে প্রয়োগ করা উচিত, পাশাপাশি পিতামাতাকে বিকল্প শৃঙ্খলা পদ্ধতি ও মানসিক সমর্থন প্রদান করা জরুরি। পরিবারে ইতিবাচক যোগাযোগ ও পেশাদার পরামর্শের মাধ্যমে শিশুর বিকাশকে সুরক্ষিত করা সম্ভব; আপনি কি আপনার পারিবারিক পরিবেশে অ-হিংসাত্মক শৃঙ্খলা পদ্ধতি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত?



