মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, তিনি নিজেকে স্বৈরশাসক হিসেবে বিবেচনা করেন এবং কখনও কখনও এমন শাসনের প্রয়োজন হতে পারে। এই মন্তব্য তিনি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে একটি ভাষণের পর প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর গ্রিনল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপের সম্পর্ক নিয়ে তার পূর্বের মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। ফোরামের শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, “আমরা দারুণ একটা ভাষণ দিয়েছি, অসাধারণ প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। বিশ্বাসই হচ্ছে না, সবাই ভালো রিভিউ দিয়েছে।”
এরপর তিনি যুক্তি দেন, “সাধারণত তারা বলে— ও (ট্রাম্প) ভয়ঙ্কর একজন স্বৈরশাসক ধরনের মানুষ। আমি তো স্বৈরশাসকই।” তিনি আরও যোগ করেন, “কিন্তু কখনও কখনও একজন স্বৈরশাসক দরকার! তবে এবার তারা সেটা বলেনি। এটা সাধারণ বোধের ওপর ভিত্তি করে বলা— এটা রক্ষণশীল বা উদারপন্থি কিছু নয়।”
ট্রাম্পের স্বৈরশাসক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা প্রথমবারের নয়। গত বছরের আগস্টে, ওয়াশিংটনে অপরাধ ও অভিবাসন দমনে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন এবং পতাকা পোড়ানোর ঘটনার তদন্তে স্বাক্ষর করার সময় তিনি একই রকম মন্তব্য করে ছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, “আমেরিকানরা হয়তো একজন স্বৈরশাসকই চাইছে,” এবং যুক্তি দেন যে তার কঠোর পদক্ষেপের প্রশংসা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না।
সেই সময়ের সাক্ষাৎকারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, “তারা বলে, আমাদের তাকে দরকার নেই। স্বাধীনতা, স্বাধীনতা। সে স্বৈরশাসক। অনেক মানুষ বলছে, হয়তো আমরা একজন স্বৈরশাসকই পছন্দ করি।” তবে পরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি স্বৈরশাসক পছন্দ করি না। আমি স্বৈরশাসক নই। আমি সাধারণ বোধসম্পন্ন একজন মানুষ এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তি।”
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্টিয়াল নির্বাচনের পূর্বে ফক্স নিউজের শন হ্যানিটির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবার শাসন পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন আমি স্বৈরশাসকের মতো হই— তবে তা কেবল প্রথম দিনই।” এই মন্তব্যটি তার শাসন শৈলীর প্রতি আগ্রহ এবং স্বীকারোক্তি উভয়ই প্রকাশ করে।
ট্রাম্পের শক্ত হাতে শাসনকারী নেতাদের প্রশংসা নতুন নয়। তিনি পূর্বে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে “বুদ্ধিমান”, “খুবই বুদ্ধিমান” এবং “শক্তিশালী নেতা” বলে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তিনি “শক্তিশালী”, “খুব সম্মানিত” এবং “হলিউডের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতো” বর্ণনা করেছেন। এই মন্তব্যগুলো তার আন্তর্জাতিক নেতাদের প্রতি প্রশংসার ধারাকে তুলে ধরে।
ট্রাম্পের এই স্বীকারোক্তি এবং পূর্বের সমানধর্মী মন্তব্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার সঞ্চার করেছে। রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে তার শাসন পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে পারে, বিশেষ করে যারা তার স্বৈরশাসক স্বভাবকে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, তার সমর্থকরা তার দৃঢ় নেতৃত্বের প্রশংসা করে, যা পার্টির ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। স্বৈরশাসক শাসনের স্বীকৃতি ও প্রশংসা কিছু দেশকে উদ্বিগ্ন করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে গণতান্ত্রিক নীতি শক্তিশালী। তবে ট্রাম্পের এই প্রকাশনা তার নিজস্ব রাজনৈতিক ব্র্যান্ডকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার একটি কৌশলও হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের স্বৈরশাসক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা এবং কখনও কখনও এমন শাসনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা তার রাজনৈতিক রণকৌশলের একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়। এই বক্তব্যের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ, পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।



