৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে। তবে এই বছরের মেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন উপস্থিত থাকবে না, ফলে মেলায় বাংলাদেশি প্রকাশনা ও লেখকদের বই পাঠকদের হাতে পৌঁছাবে না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট অনুমোদনের অনুপস্থিতি রয়েছে, যা প্রকাশক গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ের মতে অপরিহার্য শর্ত।
প্রকাশক ও বুকসেলার গিল্ডের মুখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মেলায় স্টল বরাদ্দের জন্য বিদেশ মন্ত্রকের অনুমোদন প্রয়োজন, এবং তা না পেলে কোনো প্রকাশককে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া সম্ভব নয়। গিল্ডের কর্মকর্তারা মেলার নিরাপত্তা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করছিলেন, তবে অনুমোদন না পাওয়ায় এই বছরও বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন বাদ পড়বে।
১৯৯৬ সাল থেকে কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশি প্রকাশনা ধারাবাহিকভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। রকমারি, লিটল ম্যাগাজিন এবং দেশের প্রধান প্রকাশনাগুলোর সমাহার মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে ২০২৫ সালের শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অংশগ্রহণ বাতিল হয়, এবং ২০২৬ সালে একই পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
দুই দেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে নতুন দায়িত্বশীলদের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সমন্বয় পুনর্গঠন হয়েছে, যার ফলে ভিসা, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। শুবঙ্কর দে, দে পাবলিশিংয়ের প্রধান, উল্লেখ করেছেন যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশকে মেলায় স্থান দেওয়া কঠিন, যদিও তারা অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর কূটনৈতিক গতিবিধির সঙ্গে তুলনা করছেন। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক বন্ধন সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, জলসম্পদ এবং বাণিজ্যিক শুল্ক বিষয়ক মতবিরোধ তীব্রতর হয়েছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফলে সাংস্কৃতিক মঞ্চে, বিশেষ করে বইমেলার মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে, সহযোগিতা সীমিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, মেলার পরবর্তী কয়েক মাসে দু’দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে পুনরায় সংলাপের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক, যা শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, সেখানে সংস্কৃতি ও প্রকাশনা ক্ষেত্রের সহযোগিতা পুনরায় সক্রিয় করার প্রস্তাব থাকতে পারে। তবে তা বাস্তবায়িত হতে হলে উভয় পক্ষের সরকারকে স্পষ্ট নীতি ও অনুমোদন প্রদান করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিশ্চয়তা না দেখা দেয়।
বইমেলা সংগঠকরা জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশি প্রকাশকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বই বিক্রয়ের সুযোগ তৈরি করা হবে, যাতে পাঠকরা তবুও নতুন প্রকাশনা সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। তবে এই ডিজিটাল বিকল্পের পরিধি ও কার্যকারিতা এখনও নির্ধারিত হয়নি।
সারসংক্ষেপে, ২০২৬ সালের কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন না থাকায় দুই দেশের সাহিত্যিক ও প্রকাশনামূলক সংযোগে একটি ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে। এই ফাঁকটি মূলত কূটনৈতিক অমিল ও অনুমোদনের অভাবে উদ্ভূত, এবং ভবিষ্যতে উভয় দেশের সরকার কীভাবে এই বাধা অতিক্রম করবে তা নির্ধারণ করবে পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার দিকনির্দেশনা।



