দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ঢাকা ১ জেলার দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে জমি দখল ও জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। মামলাটি দুদকের উপসহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুনের স্বাক্ষরে দাখিল করা হয়।
মামলায় রূপায়ণ গ্রুপের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজউকের নীতি নির্ধারক ও মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল, পরিচালক রোকেয়া বেগম নাসিমা, মাহির আলী খান রাতুল, ফরিদা বেগম, আলী আকবর খান রতন এবং এস্টেট অফিসার সাজ্জাদ হুসাইনকে প্রথম দফার আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা) জিয়াউল হাসান, সদস্য (উন্নয়ন) আব্দুর রহমান, সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আব্দুল মান্নান, উপ‑নগর পরিকল্পনাবিদ কামরুল হাসান সোহাগসহ বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলী, নকশাকার এবং পরিদর্শককেও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুসারে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি জমি দখল করেছে এবং রাজউকের কর্মকর্তারা যথাযথ যাচাই‑বাছাই ও সরেজমিন পরিদর্শন না করেই রূপায়ণকে অবৈধ সুবিধা প্রদান করেছে। রূপায়ণ কর্তৃপক্ষ রাজউকের কাছে ৪১.৫৪৮ একর জমিতে পাঁচ ধাপে বিশেষ প্রকল্প অনুমোদনের আবেদন করলেও কাগজপত্রে মাত্র ১৬.৩২ একর জমির তথ্য জমা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
মহানগর জরিপের খতিয়ান ও আরএস দাগ অনুযায়ী ওই জমির মধ্যে ২.৩৫ একর সরকারী ভাওয়াল রাজ এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত এবং ১ একর খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায় রূপায়ণ হাউজিং এই সরকারি সম্পত্তি বিলীন করে ড্যাপ নির্ধারিত ৬০ ফুট রাস্তা নিজেদের প্রকল্প এলাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা অনুসারে বিশেষ প্রকল্পের অনুমোদন পেতে আবেদনকারীকে জমির মালিকানায় নিরঙ্কুশ হতে হয়। তবে এই মামলায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও মালিকানা বিরোধের তথ্য গোপন করে ভুয়া রেকর্ডপত্রের মাধ্যমে রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
দুদকের তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড ২.৫১ একর জমি কিনতে মোস্তফা জামাল গংয়ের সঙ্গে বায়না ও সমঝোতা চুক্তি করেছে। তবে চুক্তি অনুসারে মূল্য পরিশোধের প্রক্রিয়া ও জমির হস্তান্তর সম্পূর্ণ না হওয়ায় মামলায় অতিরিক্ত আর্থিক অসঙ্গতি প্রকাশ পেয়েছে।
মামলায় রূপায়ণ গ্রুপের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রূপায়ণ গ্রুপের আর্থিক ও আইনি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া রাজউকের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগে কাজ করা বিভিন্ন স্তরের কর্মী, প্রকৌশলী ও পরিদর্শককেও দায়ের করা হয়েছে, যাদের ভূমিকা ছিল জমির প্রকৃত অবস্থা যাচাই না করে অনুমোদন প্রদান করা।
দুদক মামলায় উল্লেখ করেছে যে রূপায়ণ হাউজিং জমি দখলের জন্য সরকারি রেকর্ডে পরিবর্তন আনা, জালিয়াতি করে জমির পরিমাণ কমিয়ে দেখানো এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করা হয়েছে। মামলায় রূপায়ণ হাউজিংকে ৬০ ফুট রাস্তা ও সরকারি সম্পত্তি নিজের প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নকশা অনুমোদন পেতে জালিয়াতি করা অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আদালত এখন পর্যন্ত কোনো রায় দেয়নি, তবে দুদক মামলাটি আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা উপেক্ষা করে দায়ের করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। আদালত থেকে শীঘ্রই শুনানির তারিখ জানানো হবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে তাদের প্রতিক্রিয়া দিতে হবে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যদি আদালত রূপায়ণ হাউজিং ও রাজউকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ী সাব্যস্ত করে, তবে তারা জমি দখল ও জালিয়াতির জন্য শাস্তি পেতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা হবে। একই সঙ্গে, দুদকের তদন্তে উন্মোচিত তথ্যের ভিত্তিতে আরও তদন্ত ও দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই মামলাটি দেশের জমি দখল ও সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত সমস্যার ওপর নতুন দৃষ্টিকোণ এনে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ জালিয়াতি রোধে কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।



