দিল্লিতে ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্বর্তী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকালে বাংলাদেশ কোনো সরকারি মন্তব্যের প্রত্যাশা করে না। এই সাক্ষাৎকারটি বিবিসি ইন্ডিয়া ২১ জানুয়ারি তাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করে, যেখানে দশ মিনিটের আলোচনায় দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে হোসেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জটিলতা ও টানাপোড়েনের মূল কারণগুলো তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও কিছু ভুল বোঝাবুঝি ও অস্বস্তি রয়েছে, তবে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে উভয় দেশের জন্য সুসম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন, কোনো তৎপরতা বা হঠাৎ পদক্ষেপ উভয়ের জন্যই অনুকূল নয়।
হোসেনের মতে, ভারত সরকার শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতি নিয়ে কোনো প্রত্যাশা রাখে না এবং তাই বাংলাদেশও কোনো বিবৃতি প্রকাশের প্রয়োজন অনুভব করে না। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে তৎকালীন মন্তব্য বা মন্তব্যের অভাব উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই উভয় পক্ষকে সংযম বজায় রেখে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করা উচিত।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়েও হোসেন স্পষ্ট অবস্থান নেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের প্রতি কোনো ধরনের হিংসা বা নিপীড়ন ঘটলে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের গ্রেফতার করে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতীয় সরকার কখনোই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সমস্যার উপর মন্তব্য করে না এবং এই নীতি উল্টো দিকেও প্রযোজ্য হওয়া দরকার।
হোসেনের মন্তব্যে অতিরিক্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ করা হয়েছিল। যদিও দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধের ছাপ রয়ে গেছে, তবু উভয় সরকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি জোর দেন, শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব।
বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, হোসেনের এই রূপরেখা বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক মঞ্চে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি যে হঠাৎ কোনো মন্তব্য না করার ওপর জোর দিয়েছেন, তা ভবিষ্যতে উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক শুল্ক ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে এই নীতি অনুসরণ করা হতে পারে।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন জাতীয় নির্বাচন, ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও মতামত প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক লেনদেন ও শ্রমিক প্রবাহের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে উভয় পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বলছেন, কোনো অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ উভয় দেশের স্বার্থের বিরোধী।
হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, পূর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় যে বাংলাদেশ সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষও একই রকম নীতি মেনে চললে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়বে।
বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই রকম কূটনৈতিক সতর্কতা কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে হোসেনের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন ও স্বার্থ রক্ষার জন্য কূটনৈতিক সংযম বজায় রাখতে চায়।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিণতি হিসেবে, হোসেনের এই রূপরেখা দুই দেশের কূটনৈতিক মিটিং ও উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার এজেন্ডায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, সীমান্তে চলমান বাণিজ্যিক বিরোধ ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে, উভয় দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রীরা এই বিষয়গুলোতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারেন।
সারসংক্ষেপে, তৌহিদ হোসেনের মন্তব্য বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রদান করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো তৎপরতা বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর, আর সংখ্যালঘু সমস্যায় পারস্পরিক অ-হস্তক্ষেপের নীতি বজায় রাখা উভয় দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।
অবশেষে, হোসেনের বক্তব্যের ভিত্তিতে উভয় দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে সংলাপের গুরুত্ব পুনরায় উজ্জ্বল হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য না করে, কূটনৈতিক সংযম ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করা সম্ভব হবে।



