ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জ্যামশিদ আলমের আদালতে গত বৃহস্পতিবার দীন ইসলাম বেপারী হত্যার রিমান্ড শোনানিতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের দক্ষিণ শাখার সভাপতি কামরুল হাসান রিপন তার শারীরিক আঘাত ও মানসিক কষ্টের কথা জানালেন। রিপন বললেন, তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় রাত একটার দিকে ‘মব’ করে তার পরিবারকে সামনে মারধর করা হয়েছিল।
আক্রমণের পর পুলিশে হেফাজতে নেওয়া রিপনকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা সেবা নেওয়ার পরই তিনি জেলখানায় পাঠানো হয় এবং রিমান্ড শোনানির জন্য আদালতে হাজির হন।
পরদিন, যাত্রাবাড়ী থানা থেকে এসআই রাসেল সরদার রিপনকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। তবে একই আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় এবং রিমান্ড শোনানির তারিখ বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করে। শোনানির দিন রিপনের পক্ষে অ্যাডভোকেট ওবায়দুল ইসলামসহ কয়েকজন আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের জন্য জামিনের আবেদন দাখিল করেন।
আদালতের অনুমতি নিয়ে রিপন তার শারীরিক অবস্থা ও রাজনৈতিক পটভূমি ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের রোগে ভুগছেন এবং সরকার পতনের সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি অতীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন, তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ ওঠেনি। রিপন বলেন, “মব করে আমার পরিবারে মারধর করা হয়েছে” এবং তার হৃদরোগের সমস্যার কারণে তিনি ঘরে ছিলেন।
বক্তব্যের শেষে রিপন অশ্রুপাত করেন এবং ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। শোনানির পর আদালত দুই দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়, যা প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মহিন উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন।
দীন ইসলাম বেপারীর হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সরকার পতনের মুহূর্তে, ছাত্রজনতা শাহবাগের উদ্দেশ্যে মিছিল বের করে। মিছিলটি যাত্রাবাড়ী থানা চৌরাস্তার কাছে পৌঁছালে পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হঠাৎ আক্রমণ চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়া দীন ইসলাম শেষ পর্যন্ত মারা যান। এই ঘটনার পর গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যার মামলা দায়ের হয়।
বর্তমানে, দীন ইসলাম বেপারীর হত্যার মামলায় তদন্ত চলমান। তদন্তকারী অফিসাররা ঘটনাস্থল, গুলিবিদ্ধের দেহের অবস্থা ও গুলির ধরন বিশ্লেষণ করছেন। একই সঙ্গে, রিপনের ওপর আনা অভিযোগের ভিত্তিতে রিমান্ডের প্রয়োজনীয়তা ও তার শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রভাব বিচারাধীন। আদালত রিমান্ডের সময়কাল নির্ধারণের পাশাপাশি, রিপনের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করতে পারে কিনা তা নির্ধারণের দায়িত্বে রয়েছে।
প্রসিকিউশন দল রিমান্ডের সময়কালে রিপনের সাক্ষ্য ও শারীরিক প্রমাণ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে, রক্ষা দল রিম্যান্ড বাতিলের জন্য জামিনের আবেদন দাখিল করে, যা আদালতের পর্যালোচনার অধীন। আদালত রিম্যান্ডের অনুমোদন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেবে, যা মামলার অগ্রগতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই রিমান্ড শোনানি এবং রিপনের শারীরিক অবস্থা উভয়ই দেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর আনা আইনি পদক্ষেপের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দেশের আইনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে, দীন ইসলাম বেপারীর হত্যার মামলায় সঠিক তদন্ত ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সমাজের ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করবে।
মামলার পরবর্তী ধাপগুলোতে আদালত রিম্যান্ডের শর্তাবলী নির্ধারণ করবে, এবং তদন্তকারী দল গুলিবিদ্ধের গুলির উৎস, আক্রমণের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সনাক্তকরণের জন্য অতিরিক্ত প্রমাণ সংগ্রহ করবে। এই প্রক্রিয়ায়, রিপনের শারীরিক স্বাস্থ্যের অবস্থা, তার রাজনৈতিক পটভূমি এবং মামলার মূল অভিযোগের মধ্যে সমন্বয় বজায় রেখে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
সামগ্রিকভাবে, দীন ইসলাম বেপারীর হত্যার মামলায় এবং রিপনের রিম্যান্ড শোনানিতে উভয়ই আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক দিকের সমন্বয় প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্ব হল যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ, ন্যায়সঙ্গত রায় প্রদান এবং শিকারের পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।



