বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে, সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখা যাচ্ছে। এই ক্লিপগুলোতে সাধারণ নাগরিকের মতো দেখানো ব্যক্তিরা ভোটের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক সমর্থন এবং বিরোধী দলের সমালোচনা প্রকাশ করছেন। তবে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই ‘বক্তারা’ প্রকৃত মানুষ নয়; তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত চরিত্র।
ডিসমিসল্যাব নামে একটি ফ্যাক্ট‑চেকিং ও মিডিয়া গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, জানুয়ারি ২০২৬‑এ তারা একটি ফেসবুক পেজ ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’ থেকে ৩৫টি ভিডিও বিশ্লেষণ করে এআই‑উৎপাদিত বা এআই‑সম্পাদিত বলে নির্ধারণ করেছে। এই ভিডিওগুলোতে বাস্তবসম্মত চরিত্রগুলো নিজেদেরকে ভোটার হিসেবে পরিচয় দিয়ে, জামাত‑ই‑ইসলামির ‘ব্যালেন্সিং স্কেলস’ চিহ্নকে সমর্থন করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন পেজের ইতিহাসও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টটি প্রথমে ৩০ অক্টোবর ২০২১‑এ ‘হিউম্যান হেল্প’ নামে তৈরি হয়, একই দিনে ‘হেল্প মিশন’ নামে নাম পরিবর্তন করে, পরে ৩০ ডিসেম্বর ২০২১‑এ ‘হুম বলো’ এবং অবশেষে ৭ জুলাই ২০২২‑এ ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’ নামে রূপান্তরিত হয়। পেজের স্বচ্ছতা তথ্য অনুযায়ী সাতজন প্রশাসক বাংলাদেশ থেকে পরিচালনা করছেন এবং ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনের সময় অনুসারে অনুসারীর সংখ্যা ৯০,০০০‑এর বেশি।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই পেজের এআই‑ভিত্তিক রাজনৈতিক ভিডিও প্রথম প্রকাশ পায় ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫‑এ, যা নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার (১২ ডিসেম্বর) কিছু দিন পরের ঘটনা। পরবর্তীতে, বাংলা দৈনিক প্রথম আলো একই পেজের অনুসারী সংখ্যা বাড়ার কথা জানিয়ে, ফেসবুক, টিকটক এবং ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এআই‑লেবেলযুক্ত রাজনৈতিক ক্লিপের বিস্তার উল্লেখ করেছে।
ভিডিওগুলোর গঠন পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন অনুসরণ করে। প্রথমে একটি সংক্ষিপ্ত ‘স্ট্রিট ইন্টারভিউ’ দেখা যায়, যেখানে বয়স্ক মহিলা, ফল বিক্রেতা বা অনুরূপ সাধারণ পেশার মানুষকে ক্যামেরা সামনে নিয়ে তাদের ভোটের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক পছন্দ প্রকাশ করানো হয়। এরপর এআই‑সৃষ্ট চরিত্রগুলো জামাত‑ই‑ইসলামির চিহ্নের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে, দর্শকদেরও একই পথে চলতে আহ্বান জানায়।
এই ধরনের কৃত্রিম কন্টেন্টের উত্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময়ে এআই ব্যবহার করে নকল সাক্ষ্য, কণ্ঠস্বর অনুকরণ এবং কম খরচে প্রভাবশালী বার্তা প্রচার করা সম্ভব হওয়ায়, ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশে নির্বাচনের দিন নিকটবর্তী হওয়ায়, এই এআই‑ভিত্তিক ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফেসবুকের অনুসারী সংখ্যা বৃদ্ধি, টিকটক ও ইউটিউবে শেয়ার সংখ্যা বাড়া, এবং বিভিন্ন গ্রুপে পুনরায় পোস্ট করা—all এই বিষয়গুলো নির্বাচনী পরিবেশকে জটিল করে তুলছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নির্দেশ করে যে এই কন্টেন্টের প্রতি ব্যবহারকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে, এআই‑সৃষ্ট ভিডিওগুলোতে ব্যবহৃত ‘ব্যালেন্সিং স্কেলস’ চিহ্ন জামাত‑ই‑ইসলামির প্রচারমূলক উপাদান হিসেবে পরিচিত, যা নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পেজের প্রশাসকরা এআই টুল ব্যবহার করে চরিত্রের মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর এবং কথোপকথনের স্বাভাবিকতা বাড়িয়ে তুলেছেন, ফলে দর্শকদের জন্য এই ভিডিওগুলো বাস্তবের মতো মনে হয়। তবে এআই‑সৃষ্ট কন্টেন্টের প্রকৃত উৎস ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট না থাকায়, ভোটারদের বিভ্রান্তি ও মিথ্যা তথ্যের ঝুঁকি বাড়ছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, নির্বাচন কমিশন ও সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সম্ভাব্য এআই‑ভিত্তিক মিথ্যা প্রচার রোধে নজরদারি বাড়ানোর কথা প্রকাশ করেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ বা নির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা হয়নি।
নির্বাচনের আগে এই ধরনের কৃত্রিম কন্টেন্টের প্রভাব কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন বাড়বে এবং সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোকে এআই‑সৃষ্ট মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত ও সরিয়ে ফেলতে প্রযুক্তিগত সমাধান গড়ে তুলতে হবে।
উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন পেজের এআই‑ভিত্তিক ভিডিওগুলো, জামাত‑ই‑ইসলামির সমর্থনমূলক বার্তা এবং নির্বাচনী সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকাশের মাধ্যমে, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন এক চ্যালেঞ্জের সূচনা করেছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের উপর প্রভাব ফেলবে।



