বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি বাড়ছে; সরাসরি রোড শো শুরু হওয়ার কথা যদিও, রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তীব্র প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে। বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন শুরু হবে, তবে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কে প্রচার ইতিমধ্যে কয়েক মাসের আগে চালু।
বড় দলগুলো বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে ডিজিটাল কৌশল গড়ে তুলেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা আন্দোলনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘জেন-জি’ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে, পার্টিগুলো ভিডিও, লাইভ স্ট্রিম ও শেয়ারযোগ্য কন্টেন্ট ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অনলাইন লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল রাজনৈতিক গানের ব্যবহার। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামের সমর্থনে তৈরি একটি গান সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপক শেয়ার পেয়েছে; এতে ঐতিহ্যবাহী নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গলের বদলে ‘দাঁড়িপাল্লা’ নামে নতুন ভবিষ্যৎকে তুলে ধরা হয়েছে। এই সৃজনশীল উপাদান ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে কাজ করছে।
ডিজিটাল প্রচারণার পেছনে দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বিশাল সংখ্যা এবং তরুণ ভোটারদের অধিকাংশ গঠনমূলক ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকম কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৭৪ শতাংশের কাছাকাছি। একই সময়ে ফেসবুকের ব্যবহারকারী সংখ্যা ৬.৪ কোটি, টিকটকের ব্যবহারকারী সংখ্যা ৫.৬ কোটি।
ভোটার বয়সের গড়ও উল্লেখযোগ্য; মোট ভোটারদের ৪৩.৫৬ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে, যার মধ্যে বড় অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। পূর্ববর্তী নির্বাচনের প্রশ্নবিদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত বোধের কারণে তরুণদের ভোটের ইচ্ছা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দলগুলোকে অনলাইন উপস্থিতি বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারও এই ডিজিটাল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সংস্কার প্যাকেজের ওপর একটি গণভোটের পরিকল্পনা করেছে। সরকারী মুখপাত্র শফিকুল আলম উল্লেখ করেছেন, প্রচলিত মিডিয়ার তুলনায় সামাজিক মিডিয়া এখন অধিক প্রভাবশালী, তাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারও ডিজিটাল চ্যানেলে চালু করা হবে।
রাজপথে প্রচারণা শুরু হলেও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে অনলাইন আলোচনার গতি ও প্রভাবের ওপর। সামাজিক নেটওয়ার্কে শেয়ার, মন্তব্য ও লাইক সংখ্যা ভোটারদের মতামত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের জোটের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা ডিজিটাল মিডিয়াকে ‘জনমত গঠন’ ও ‘নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ’ করার মূল হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা দাবি করে, অনলাইন ক্যাম্পেইন ভোটারদের সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং প্রচলিত রোড শোর তুলনায় দ্রুত পৌঁছায়।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ এখনও সরাসরি রোড শো ও ঐতিহ্যবাহী প্রচারণা পদ্ধতিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও তারা সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার বাড়াচ্ছে, তবে প্রধানত পার্টির নীতি ও কর্মসূচি তুলে ধরতে এই চ্যানেলগুলোকে সহায়ক হিসেবে দেখছে।
ডিজিটাল কন্টেন্টের বৈচিত্র্য বাড়াতে, দলগুলো ভিডিও এডিটিং, অ্যানিমেশন ও ইনফোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে তাদের মেসেজকে আকর্ষণীয় করে তুলছে। বিশেষ করে টিকটকে সংক্ষিপ্ত, রঙিন ক্লিপের মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের মনোযোগ অর্জন করা হচ্ছে।
সামাজিক মিডিয়ার প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের গতি ও ভ্রান্তি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। যদিও বর্তমান প্রতিবেদনে কোনো গুজব বা ভুল তথ্যের উল্লেখ নেই, তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে দ্রুত শেয়ার হওয়া কন্টেন্টের সত্যতা যাচাই করা কঠিন হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচনের প্রস্তুতি রোড শো ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের সমন্বয়ে চলছে। তরুণ ভোটারদের বড় অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দেবে, এবং সামাজিক নেটওয়ার্কে রাজনৈতিক গানের, ভিডিও ও ইন্টারেক্টিভ কন্টেন্টের ব্যবহার ভোটের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার ও প্রধান দলগুলো উভয়ই অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ভোটার সংযোগের মূল মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা নির্বাচনের ফলাফলকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে গঠন করবে।



