সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর তীব্র সমালোচনা করেন। ২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত তার বক্তৃতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সহায়তা না থাকলে আজ ইউরোপের মানুষ মূলত জার্মান ও কিছুটা জাপানি ভাষায় কথা বলত বলে দাবি করেন। ট্রাম্পের মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ইচ্ছা স্পষ্ট হয়।
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অধিগ্রহণের ইচ্ছা পুনরায় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উত্তর আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য গ্রিনল্যান্ডের বৃহৎ বরফের অংশটি অপরিহার্য। এই অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ মালিকানায় নেওয়ার কথা তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদিও তিনি স্পষ্ট করে জানান যে এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করছেন না।
প্রেসিডেন্টের মতে, গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমি ফেরত দেওয়া একটি “বোকামি” ছিল। তিনি যুক্তি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অপরাজেয় এবং এই স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। তার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত স্বভাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উত্তর আমেরিকান নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
ট্রাম্প ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামরিক ব্যয়ের ওপরও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তার হস্তক্ষেপের ফলে এখন ন্যাটো দেশগুলো তাদের জিডিপির পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত সামরিক বাজেট ব্যয় করছে, যা আগে অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই পরিবর্তনকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে “অকৃতজ্ঞ” বলে সমালোচনা করেন।
ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করার জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, ট্রাম্পের মতে দেশটি এই অর্থের এক শতাংশও ব্যবহার করেনি। তিনি ডেনমার্কের এই অগ্রগতি না দেখার বিষয়টি তুলে ধরে দেশের নিরাপত্তা নীতির প্রতি তার অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
বক্তৃতার একটি অংশে ট্রাম্প বারবার গ্রিনল্যান্ডকে ভুল করে “আইসল্যান্ড” বলে উল্লেখ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে এই ভুলের ফলে ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এই ভুল নাম উল্লেখের মাধ্যমে তিনি ডেনমার্কের নীতির প্রতি তার বিরক্তি প্রকাশ করেন।
ট্রাম্প তার পূর্বে প্রস্তাবিত “গোল্ডেন ডোম” নামে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রিনল্যান্ডে স্থাপনের পরিকল্পনাকে পুনরায় জোর দেন। তিনি বলেন, এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তা বাড়াবে এবং রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলায় সহায়ক হবে।
ইউরোপের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে “অনিয়ন্ত্রিত গণঅভিবাসন”কে প্রধান সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, এই প্রবাহের ফলে ইউরোপের অনেক অঞ্চল তাদের পরিচয় হারাচ্ছে এবং সংস্কৃতি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ট্রাম্পের মতে, ইউরোপ বর্তমানে ভুল পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং তার নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যে তিনি দেশের অর্থনীতিকে “অলৌকিক” বলে বর্ণনা করেন। তিনি দাবি করেন, তার শাসনামলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি ইউরোপের তুলনায় অধিক কার্যকর।
ব্রিটেনের জ্বালানি নীতি নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যুক্তি দেন, উত্তর সাগরের বিশাল তেল ও গ্যাস সম্পদকে যথাযথভাবে ব্যবহার না করা ব্রিটেনের জন্য ক্ষতিকর এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এই মন্তব্যে তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর জ্বালানি কৌশলকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেন।
ট্রাম্পের এই ধারাবাহিক মন্তব্যগুলো ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণ, ন্যাটো ব্যয় এবং অভিবাসন নীতি সংক্রান্ত তার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনা রাখে।



