খুলনা বিভাগীয় অডিটোরিয়ামে ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদ মর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তার মতামত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রার্থী কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়; ভোটার নিজে, তার পরিবার ও সমাজই প্রকৃত প্রার্থী। এই ভোটের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে।
সভায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. মোখতার আহমেদ সভার সভাপতিত্ব করেন এবং রীয়াজের বক্তব্যের পর প্রশ্নোত্তর সেশন অনুষ্ঠিত হয়। রীয়াজ উল্লেখ করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে এবং জনগণকে ভোট কেন্দ্রে পরিচিতদের সঙ্গে উপস্থিত হতে উৎসাহিত করতে হবে। তিনি দেশের পরিবর্তনের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের ওপর তুলে ধরেন।
ফ্যাসিবাদী শাসন ও স্বৈরশাসনের বিরোধে জাতি আর কোনো দুঃশাসন চায় না, এ কথাটি রীয়াজ জোর দিয়ে বলেন। তিনি একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ, সমতা ও আনন্দের দেশ গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যেখানে কোনো নাগরিককে ‘অন্তরাত্মা কাঁপানো বাহিনীর’ হাতে গুম হওয়ার ভয় থাকবে না, আর গায়েবি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্ক থাকবে না। এই স্বপ্নকে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ত্যাগের সঙ্গে যুক্ত করেন, যা দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
রীয়াজের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। যদিও কিছু সংস্কার ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, তবু আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা জনগণের সরাসরি সম্মতি ছাড়া কার্যকর করা যাবে না।
গণভোটের মাধ্যমে এই সনদকে বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সম্মতি নেওয়া হবে, এটাই রীয়াজের মূল বার্তা। তিনি ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের গঠনকে সমর্থন করতে আহ্বান জানান। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে, ফলে ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
রীয়াজ আরও উল্লেখ করেন, নতুন গঠিত সরকারে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন, যা রাজনৈতিক সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। তিনি ভোটারদেরকে উৎসাহিত করেন, যেন তারা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
কিছু বিরোধী দল ও বিশ্লেষকরা গণভোটের সময়সীমা ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা দাবি করেন, ভোটের ফলাফল নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার এবং সকল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। তবে রীয়াজের বক্তব্যে এই উদ্বেগগুলোকে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।
গণভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে পারে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধানিক কাঠামো গড়ে উঠলে সরকার-বিরোধী সম্পর্কের ভারসাম্য পুনর্গঠন হবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের ফলাফল সনদের বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করতে পারে এবং বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে স্থবির করতে পারে।
রীয়াজের এই প্রচারণা সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা জনগণকে ভোটের মাধ্যমে দেশের দিকনির্দেশ নির্ধারণে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, সংবিধানিক সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার দিক নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে।



