বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমান বৃহস্পতিবার বিকেল একটায় সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় বিরোধী দলের কোনো কার্যকলাপের প্রতি তীব্র সমালোচনা জানিয়ে ‘নাউজুবিল্লাহ’ বাক্যটি ব্যবহার করেন। অনুষ্ঠানটি দুপুর একটার দিকে শুরু হয় এবং উপস্থিত ভক্তদের সামনে তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সংযোগ।
তারেক রহমান মঞ্চে উঠে প্রথমে উপস্থিত দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ধর্মীয় নীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরেন। এরপর তিনি মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অজানা ব্যক্তিকে ডেকে, তাকে ধর্মীয় প্রশ্ন করেন: “এই দুনিয়া, জান্নাত ও জাহান্নামের মালিক কে?” ব্যক্তিটি উত্তর দেয়, “আল্লাহ।” এই উত্তরকে ভিত্তি করে তিনি বলেন, “যেখানে জান্নাত ও জাহান্নামের মালিক আল্লাহ, সেখানে কিছু মানুষ এখনও দুনিয়ার লোভে মগ্ন।”
এরপর তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যারা আপনাদের আগে ধোঁকা দিচ্ছিল, তারা পরে কী করবে?” এই রূপক প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি বিরোধী দলের অতীতের ভুল এবং ভবিষ্যতে তার সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করেন। তারেক রহমানের এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তার দলের নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ধর্মীয় রেফারেন্সের মাধ্যমে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হচ্ছে।
বিএনপি তারেক রহমানের এই র্যালি তার পারিবারিক ঐতিহ্যকে উল্লেখ না করে নয়। তিনি তার পিতামহ, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-র রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে স্মরণ করে, সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এই ধর্মীয় স্থানগুলোতে জিয়ারত করা তারেকের জন্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে, যা তার রাজনৈতিক বার্তাকে শক্তিশালী করে।
রাতের দিকে তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুর গ্রামে জুবাইদার পৈতৃক বাড়িতে যান। সেখানে সংক্ষিপ্ত সময় বসে, পরে হোটেলে ফিরে রাত কাটান। এই সফর তার জন্য ১৭ বছর পর প্রথমবারের মতো ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় রাজনৈতিক কাজের জন্য যাওয়া, যা তার দলের ভিত্তি সম্প্রসারণের ইচ্ছা প্রকাশ করে।
বিএনপি দলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তারেকের এই র্যালি এবং ধর্মীয় রেফারেন্সকে ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি কৌশল হিসেবে প্রশংসা করেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিরা তারেকের মন্তব্যকে ধর্মীয় বিষয়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অভিযোগে তীব্র সমালোচনা করেন, এবং দাবি করেন যে এমন রূপক প্রশ্ন ভোটারকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
এই র্যালি সিলেটের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে। তারেকের উপস্থিতি এবং তার বক্তৃতা স্থানীয় নেতাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, তারেকের ধর্মীয় রেফারেন্স এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের ব্যবহার ভোটারদের মধ্যে তার দলের প্রতি সমর্থন বাড়াতে পারে, তবে একই সঙ্গে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে বিতর্কও উস্কে দিতে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহে বিএনপি সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় র্যালি চালিয়ে যাবে, যেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলীয় কর্মীরা স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরবে এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করবে। বিরোধী দলগুলোও তাদের নিজস্ব র্যালি ও প্রচারণা চালিয়ে যাবে, যা সিলেটের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও তীব্র করবে।
সিলেটের এই প্রথম নির্বাচনী জনসভা, তারেকের ‘নাউজুবিল্লাহ’ মন্তব্য এবং ধর্মীয় রেফারেন্সের মাধ্যমে, দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আসন্ন নির্বাচনে এই ধরনের ধর্ম-রাজনৈতিক সংযোগের প্রভাব কী হবে, তা সময়ই বলবে, তবে বর্তমান পর্যায়ে এটি স্পষ্ট যে, তারেক রহমানের র্যালি তার দলের ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিরোধী দলের প্রতি একটি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জও উপস্থাপন করেছে।



