ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যেটি এক মাসের কম সময়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবে, তার অধীনে জাতীয় বেতন কমিশন সরকারী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। কমিশনের ২৩ সদস্যের দল বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা-এ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বিশদ প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে মোট ২০টি গ্রেডের বেতন কাঠামো পুনর্গঠন, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ করা এবং সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকায়, সর্বোচ্চ বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকায় বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন গ্রহণের সময় প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস উল্লেখ করেন, “এটি একটি বিশাল কাজ, মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করে আসছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।” তিনি অতিরিক্তভাবে জানান, নতুন স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খানও একই সময়ে উল্লেখ করেন, সুপারিশকৃত বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, সরকার বর্তমানে ১৪ লক্ষ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লক্ষ পেনশনভোগীর জন্য মোট ১,৩১,০০০ কোটি টাকা ব্যয় করছে।
নতুন বেতন স্কেলে গ্রেডের সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে ২০টি ধাপ রাখা হয়েছে। পূর্বে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ছিল ১:৯.৪, এখন তা ১:৮ করা হয়েছে, যা নিম্নবেতনের কর্মীদের আয় বাড়াবে বলে আশা করা যায়। সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ২০,০০০ টাকা নির্ধারণের ফলে প্রাথমিক স্তরের কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সর্বোচ্চ ধাপে বেতন ১,৬০,০০০ টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে উচ্চ পদে থাকা কর্মকর্তাদের বেতনও দ্বিগুণের কাছাকাছি হবে। এই পরিবর্তনগুলো সরকারী বেতন কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
বেতন বৃদ্ধির বিশদ তালিকায় দ্বিতীয় ধাপে মূল বেতন ৬৬,০০০ টাকা থেকে ১,৩২,০০০ টাকা, তৃতীয় ধাপে ৫৫,৫০০ টাকা থেকে ১,১৩,০০০ টাকা, চতুর্থ ধাপে ৫০,০০০ টাকা থেকে ১,০০,০০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। পঞ্চম ধাপে ৪৩,০০০ টাকা থেকে ৮৬,০০০ টাকা, ষষ্ঠ ধাপে ৩৫,৫০০ টাকা থেকে ৭১,০০০ টাকা, সপ্তম ধাপে ২৯,০০০ টাকা থেকে ৫৮,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হবে।
অষ্টম ধাপে ২৩,০০০ টাকা থেকে ৪৭,২০০ টাকা, নবম ধাপে ২২,০০০ টাকা থেকে ৪৫,১০০ টাকা, দশম ধাপে ১৬,০০০ টাকা থেকে ৩২,০০০ টাকা বৃদ্ধি পাবে। এগারোতম ধাপে ১২,৫০০ টাকা থেকে ২৫,০০০ টাকা, বারোতম ধাপে ১১,৩০০ টাকা থেকে ২৪,৩০০ টাকা, ত্রয়োদশ ধাপে ১১,০০০ টাকা থেকে ২৪,০০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। চতুর্দশ ধাপে ১০,২০০ টাকা থেকে ২৩,৫০০ টাকা, পঞ্চদশ ধাপে ৯,৭০০ টাকা থেকে ২২,৮০০ টাকা, ষোড়শ ধাপে ৯,৩০০ টাকা থেকে ২২,০০০ টাকা পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হবে।
এই প্রস্তাবের ওপর বিরোধী দলগুলো ব্যয়বহুলতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন তুলেছে। তারা উল্লেখ করে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের বড় ব্যয়জনক পদক্ষেপ সরকারকে আর্থিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তবে সরকারী পক্ষের মতে, বেতন বৃদ্ধি কর্মীদের মনোবল বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রস্তাবকে সংসদে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করেছে। সংসদীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হবে, এবং সংশ্লিষ্ট বাজেট সংশোধন আইন পাস হওয়ার পরই বাস্তবায়ন শুরু হবে।
নতুন বেতন স্কেলের প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারী কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং জনসাধারণের কাছে দায়িত্বশীলতা প্রদর্শনের লক্ষ্য স্পষ্ট। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, বাজেট বরাদ্দ এবং রাজনৈতিক সমর্থন কতটা দ্রুত অর্জিত হবে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।



