ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত গত বৃহস্পতিবার মনিরুল ইসলাম নামে এক সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ প্রদান করেছে। সিআইডি (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) জানায়, ফেসবুকের মাধ্যমে বয়স্ক নাগরিককে লক্ষ্য করে তিনি প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। আদালতের আদেশে ৭৬ লাখ ৩২ হাজার টাকার স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
সিআইডি মিডিয়া সুপারভাইজার জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ভিত্তি হল তার অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ। তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, মনিরুল ফেসবুকে বয়স্ক ব্যক্তিদের বন্ধু অনুরোধ পাঠিয়ে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করতেন।
প্রতারণার পদ্ধতি ছিল বহুমুখী। তিনি কখনো নিজেকে ডাক্তার, কখনো কলেজের অধ্যক্ষ, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর পার্সোনাল সিক্রেটারির পরিচয়ে পরিচয় করিয়ে দেন। ফোনে নারীর কণ্ঠ নকল করে বাবা-মায়ের অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে শিকারদের সহানুভূতি অর্জন করে তৎক্ষণাৎ অর্থ চেয়ে নিতেন। একবার অর্থ পাওয়ার পর তিনি মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান।
অভিযুক্তের আর্থিক লেনদেনের পদ্ধতি আরও জটিল ছিল। নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি তিনি অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে বড় পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করতেন। এই অবৈধ তহবিলের মাধ্যমে তিনি রাজধানীর ডেমরা থানা অধীনে অবস্থিত আমুলিয়া মডেল টাউনের ৭.৫ শতাংশ জমি (দলিলমূল্য প্রায় ৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা) এবং দারুসসালাম এলাকার ২,১৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (দলিলমূল্য প্রায় ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা) ক্রয় করেন।
২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাড্ডা থানায় মানিল্যান্ডিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে (মামলা নং-১৭) মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সিআইডি উল্লেখ করে, ফেসবুকের মাধ্যমে তিনি এককভাবে ২৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত। এই আর্থিক অপরাধের প্রমাণ আদালতে উপস্থাপনের পর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আবেদন করা হয়।
আদালতের আদেশের পর সিআইডি ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মামলাটি গভীরভাবে তদন্ত করছে। বর্তমানে অভিযুক্তের আর্থিক লেনদেনের সব রেকর্ড, বিকাশ অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং সম্পত্তির দলিলাদি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্তে পাওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে অতিরিক্ত সম্পত্তি জব্দ বা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই মামলায় সিআইডি উল্লেখ করেছে যে, শিকারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মনিরুলের প্রতারণা মূলত সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে করা হয়। তিনি শিকারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে তোলার পরই অর্থ চেয়ে নিতেন, ফলে শিকারদের আর্থিক ক্ষতি বড় পরিমাণে হয়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, মানিল্যান্ডিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে আর্থিক অপরাধের শাস্তি কঠোর এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের পাশাপাশি জেল শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। আদালত এখন পর্যন্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশই দিয়েছে, তবে পরবর্তী শুনানিতে অপরাধের প্রকৃতি ও পরিমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত দণ্ড নির্ধারিত হবে।
সিআইডি কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ভবিষ্যতে অনুরূপ সাইবার প্রতারণা রোধে সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে সন্দেহজনক আচরণ সম্পর্কে সতর্কতা বাড়ানো হবে। শিকারের পরিবারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, অনলাইন পরিচিতি বা আর্থিক অনুরোধের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ছাড়া কোনো লেনদেন না করতে।



