ডাভোস, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কিত নতুন চুক্তির সম্ভাবনা প্রকাশ করেন। ৫৭,০০০ জনসংখ্যার কৌশলগত দ্বীপটি নিয়ে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের পর, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আর্টিক নিরাপত্তা ও খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিক নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ন্যাটো জোটের মধ্যে আর্টিক অঞ্চলের স্বার্থ নিয়ে মতবিরোধ তীব্রতর হয়েছে। রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, পাশাপাশি উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন, এই বিরোধকে জটিল করে তুলেছে। গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা ও ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোই এই উত্তেজনার মূল কারণ।
ট্রাম্পের পূর্বের অবস্থান স্পষ্ট ছিল; তিনি গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের হুমকি দিয়ে ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টির পাশাপাশি সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেন। তার এই রকম হুমকি-ধামকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছিল এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের ফাটল তৈরি করেছিল।
ডাভোসে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্পের মন্তব্যে দেখা গেল, তিনি গ্রিনল্যান্ডের উপর নতুন চুক্তি গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই চুক্তি দ্বীপের ‘গোল্ডেন-ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের সুযোগ প্রদান করবে, যা আর্টিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব কমাতে সহায়ক হবে।
ট্রাম্পের কথায় তিনি বলেন, “এটি এমন একটি চুক্তি যা সকলকে সন্তুষ্ট করবে, দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থায়ী হবে। নিরাপত্তা ও খনিজ ক্ষেত্রে এটি সবাইকে সত্যিকারের ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পূর্বের হুমকিমূলক রূপরেখা থেকে সরে এসে সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেন।
মার্ক রুটের পরে জানানো হয়, গ্রিনল্যান্ডের ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপের সময় কোনো আলোচনা হয়নি। রুটের মতে, বর্তমান আলোচনার মূল বিষয় আর্টিকের নিরাপত্তা, যেখানে চীন ও রাশিয়া ক্রমশ সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বিশাল অঞ্চলকে সঠিকভাবে রক্ষা করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, এটাই ট্রাম্পের প্রধান উদ্বেগ।
এর আগে, ট্রাম্প ন্যাটো মিত্র দেশগুলোর ওপর এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তীব্র সমালোচনা ও হুমকি প্রকাশ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর চাপ দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের অধিকার দাবি করেন, যা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা রুটের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্পের সুরের পরিবর্তনকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। যদিও সব সমস্যার সমাধান হয়নি, তবে মিত্রদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ কমে যাওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিবর্তনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখনো অনেক দেশ গোপনে আর্টিকের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে কাজ করছে।
গ্রিনল্যান্ডের সম্পূর্ণ মালিকানা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি এবং ডেনমার্কের বিক্রয় না করার অবস্থানের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা কী রূপ নেবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ট্রাম্পের নতুন চুক্তি প্রস্তাব এবং ন্যাটো শীর্ষে নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা উভয়ই আর্টিকের কৌশলগত গুরুত্বকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তবে ন্যাটো জোটের আর্টিক নীতি পুনর্গঠন হতে পারে, যা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে, খনিজ সম্পদের ব্যবহার ও সুরক্ষার জন্য নতুন আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
অবশেষে, ন্যাটো শীর্ষে আর্টিক নিরাপত্তা ও গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্পের পরিবর্তিত রূপরেখা এবং ন্যাটো মহাসচিবের নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি একসাথে আর্টিকের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন সমন্বয় ঘটাতে পারে।



