বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত “ব্যাংকিং খাত: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা” শীর্ষক আলোচনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পুনরাবৃত্তি রোধে আইনসভার দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ না জারি হলে ভবিষ্যতে আবারো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
গভর্নর জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের প্রভাব না পড়ে তা নিশ্চিত করা জরুরি, আর সঠিক শাসনব্যবস্থার ঘাটতি এই খাতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং সংস্কারের বহু দিক অবিলম্বে কাজের প্রয়োজন, নইলে সেক্টরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই আলোচনার আয়োজন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে করা হয়। অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রেজাউল করিম প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন, আর সমিতির আহ্বায়ক ড. মাহাবুব উল্লাহ, সদস্য সচিব ড. হেলাল উদ্দিন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নর উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশের সংশোধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, শাসনব্যবস্থা ও কার্যকর স্বাধীনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি নতুন অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে শীঘ্রই জারি হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, দুর্নীতি, অনিয়ম, পারিবারিক স্বার্থের হস্তক্ষেপ এবং সুশাসনের অভাবের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতের কার্যক্রম প্রায় ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছে। এই অবস্থা থেকে প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা সরে গেছে, যার একটি বড় অংশ সম্ভবত বিদেশে পাচার হয়েছে। তদুপরি, পারিবারিক স্বার্থের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ড. মনসুর জানান, বর্তমানে দেশে ৬১টি ব্যাংক কার্যকর রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত। বাস্তবিক চাহিদা বিবেচনা করে তিনি বলেন, ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট হবে, এবং ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে শাসনব্যবস্থা সহজতর করা সম্ভব হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা দু’টি পর্যন্ত সীমিত করা হবে, বাকি ব্যাংকগুলোকে একীভূত (মার্জ) করা হবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তন সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বিষয়ে গভর্নর আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, আগামী মার্চ মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি-ভিত্তিক তত্ত্বাবধান শক্তিশালী করা এবং ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা উল্লেখ করেন।
এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে ব্যাংক রেজ্যুলেশন ফান্ড গঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই তহবিলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যা কেবল ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে রেজ্যুলেশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে। ফান্ডের মূল উদ্দেশ্য হল আর্থিক সংকটের সময় দ্রুত হস্তক্ষেপ করে সিস্টেমিক ঝুঁকি কমানো।
সারসংক্ষেপে, গভর্নরের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি দূর করা, শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিং কাঠামোকে সংহত করা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। সংশোধিত অধ্যাদেশের দ্রুত বাস্তবায়ন, ব্যাংক সংখ্যা হ্রাস, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং রেজ্যুলেশন ফান্ডের প্রতিষ্ঠা একসাথে সেক্টরের পুনরুজ্জীবন এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ানোর মূল চালিকাশক্তি হবে।



