রাজনৈতিক দলগুলো যখন আসন্ন নির্বাচনের ম্যানিফেস্ট প্রস্তুত করছে, আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা সরকারকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শীর্ষ অগ্রাধিকার দিতে এবং পুলিশকে পার্টি‑নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখতে আহ্বান জানাচ্ছেন। তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বতন্ত্র সংস্থা গঠনের এবং নিয়মিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে উপস্থাপনের প্রস্তাবও রেখেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুলিশ বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও সুবিধা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশনের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব পুলিশ ব্যবস্থায় স্পষ্ট, যেখানে প্রায় সব দলই আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগে অভিযুক্ত। ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনকালে পুলিশকে “পার্টি ফোর্স” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সরকারী কমিশন ও কিছু মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে জবরদস্তি নিখোঁজ হওয়া এবং গুলিবর্ষণ ঘটেছে।
২০২৪ সালের ব্যাপক প্রতিবাদে আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কঠোর দমনাত্মক পদক্ষেপের ফলে জাতিসংঘের অনুমান অনুযায়ী প্রায় ১,৪০০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
ইন্টারিম সরকারের এক বছর অর্ধেক মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক না বলে বিবেচিত হয়েছে; হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি, চুরি, অপহরণ ইত্যাদি অপরাধের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের নিরাপত্তা উদ্বেগও তীব্রতর হয়েছে।
দলগত হিংসা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয় রয়ে গেছে। ২০২৫ সালে এককভাবে ১৯৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা ২০২৪ সালের ১২৮ মৃত্যুর তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে; ইন্টারিম সরকারের সময়কালে মোট ২৯৩ জনের মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ সংস্থার মধ্যে দুর্নীতি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জুন ২০২৫ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬১.৯৪ শতাংশ উত্তরদাতা জবাবদিহি ও ঘুষের অভিযোগ করেছেন, ফলে ২০২৪ সালে পুলিশকে দ্বিতীয় সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি সেবা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইন্টারিম সরকার পুলিশ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ডিসেম্বর ২০২৫-এ গেজেটের মাধ্যমে একটি পুলিশ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগের স্বতন্ত্রতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা প্রকাশ করেছেন, কারণ কমিশনের গঠন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
অধিকন্তু, মানবাধিকার সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন যে, নতুন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও শাস্তি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, যাতে পুলিশ জনসাধারণের সেবা হিসেবে কাজ করতে পারে।
এই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন নির্বাচনী ম্যানিফেস্টে অন্তর্ভুক্ত হলে, ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই দাবিগুলোকে উপেক্ষা করে, তবে পার্টি‑নিয়ন্ত্রিত পুলিশ ব্যবস্থার অব্যাহত থাকা জনমত অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, আইনশৃঙ্খলা সংস্থার সংস্কার ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্তি দেশের নিরাপত্তা পরিবেশকে স্থিতিশীল করার মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই বিষয়গুলো ম্যানিফেস্টে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির দিক নির্ধারণ করবে।



