বাংলাদেশ দ্রুত বয়স বাড়ছে; ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হবে বলে অনুমান। বর্তমানে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই পরিবারের অবৈতনিক সদস্য, বিশেষত নারীরা, দ্বারা সেবা পায়, আর সরকারী সহায়তা সীমিত। ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারিক দায়িত্বকে সম্মান করা হলেও, সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ সেবার চাহিদা ঐ প্রথাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বৃদ্ধ সেবা শুধুমাত্র জনসংখ্যা বা স্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি লিঙ্গ ন্যায়বিচারের প্রশ্নও উত্থাপন করে। আনুমানিক ৮০ শতাংশেরও বেশি অনানুষ্ঠানিক সেবা প্রদানকারী নারী ও কন্যা। তারা প্রায়ই আয়, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের ত্যাগ করে বৃদ্ধ পিতামাতা বা শাশুড়ি-শাশুড়িকে দেখাশোনা করে। একই সঙ্গে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী বেশি দিন বেঁচে থাকে, কম উপার্জন করে এবং প্রায়শই একা থাকে, ফলে তাদের ঝুঁকি বাড়ে। সেবা ব্যবস্থা না থাকলে এই দ্বৈত অসমতা আরও গভীর হয় এবং উভয় সেবা প্রদানকারী ও গ্রহণকারীই যথাযথ সমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়।
২০২৫ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং আয়াত এডুকেশন, পাশাপাশি সামাজিক সেবা বিভাগের সমন্বয়ে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় দীর্ঘমেয়াদী সেবা (LTC) নির্ণয়মূলক গবেষণা সম্পন্ন হয়। এই গবেষণায় ১,২০০েরও বেশি বৃদ্ধ, সেবা প্রদানকারী, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্থানীয় কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণার ফলাফল উদ্বেগজনক। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গৃহীত সেবা মাত্র এক শতাংশের কম বৃদ্ধকে পৌঁছায়। যেখানে সেবা রয়েছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন, সম্পদহীন এবং নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। পরিবারিক সমর্থনহীন বিধবা, শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি বা একা বসবাসকারী পুরুষদের প্রায়ই সেবা ব্যবস্থার বাইরে ফেলা হয়।
বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনাগুলোও সীমিত; আর্থিক সহায়তা কিছুটা প্রদান করা হলেও, দৈনন্দিন যত্নের চাহিদা বা অবৈতনিক সেবা প্রদানকারীদের জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই। ফলে, বৃদ্ধদের মৌলিক চাহিদা পূরণে ঘাটতি রয়ে যায় এবং পরিবারিক চাপ বাড়ে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনা করে, দীর্ঘমেয়াদী সেবাকে দান বা পারিবারিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, বরং জননীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন। সরকারকে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান উন্নয়ন, নিয়মাবলী প্রণয়ন এবং তহবিলের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সেবা প্রদানকারী নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, বেতন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তারা নিজেরাও সুরক্ষিত থাকে।
দীর্ঘমেয়াদী সেবার কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভূত স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এটি কেবল বৃদ্ধদের জীবনের গুণগত মানই উন্নত করবে না, বরং লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করবে।
অবশেষে, প্রশ্ন রয়ে যায়—বৃদ্ধ সেবার জন্য কি সরকারী বাজেটের অগ্রাধিকার বাড়ানো হবে, নাকি বর্তমান সীমিত সম্পদে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে? ভবিষ্যতে সবার জন্য গর্বের সঙ্গে বয়স বাড়ানোর জন্য নীতি নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।



