কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে, এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজের ধরণ পরিবর্তন করবে তা নিয়ে প্রশ্ন তীব্র। সরকার, শিল্প ও শ্রমিক সকলেই এখন এই পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন করার চেষ্টা করছেন।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ভয় নতুন নয়; ১৯শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটেনে লুডডাইট আন্দোলন ছিল একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ, যেখানে কারিগররা নতুন বুনন যন্ত্রকে ধ্বংস করে মানব শ্রমের স্থানচ্যুতি রোধের চেষ্টা করেছিল। সেই সময়ের উদ্বেগ আজকের AI নিয়ে আলোচনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যদিও যন্ত্রের জটিলতা ও প্রয়োগের পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
AI এখন এমন টুল ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে যা পূর্বে মানব শ্রমে নির্ভরশীল বহু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এই সরঞ্জামগুলো ক্লাউড ভিত্তিক হওয়ায়, পর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামো সম্পন্ন দেশগুলো দ্রুত গ্রহণ করতে সক্ষম। ফলে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোকে কর্মসংস্থান গঠনে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের শ্রম বাজার ইতিমধ্যে বহু কাঠিন্যের সম্মুখীন। আনুষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘাটতি, অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর উচ্চ নির্ভরতা, নারীর অংশগ্রহণের হার হ্রাস, প্রস্তুত পোশাক শিল্পে নারীর চাকরির হ্রাস এবং তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্বের হার এসব সমস্যার মূল দিক। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে AI এর প্রভাব নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্সের ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি সমীক্ষা অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন খাতে চাকরির বৃদ্ধি নগণ্য রয়ে গেছে। ফলে, শ্রম বাজারের কাঠামোগত রূপান্তর প্রত্যাশিত দিকের বিপরীতে যাচ্ছে; কৃষি খাতের অংশ বাড়ছে, উৎপাদন খাতের অংশ কমছে। এই প্রবণতা শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে।
বিশেষত, উচ্চশিক্ষিত শ্রমিকদের মধ্যে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। তৃতীয় স্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার সমগ্র শ্রমশক্তির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা দক্ষ কর্মশক্তির ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
AI প্রযুক্তির উত্থান এই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। পূর্বের শিল্প ও প্রযুক্তি বিপ্লবগুলো দেখিয়েছে যে স্বয়ংক্রিয়তা কিছু কাজের স্থানচ্যুতি ঘটাতে পারে, তবে একই সঙ্গে নতুন দক্ষতা ও পেশার সৃষ্টিও ঘটায়। তবে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই পরিবর্তনের গতি ও দিকনির্দেশনা এখনও অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS) এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, AI গ্রহণের ফলে উৎপাদন খাতে রুটিন কাজের স্বয়ংক্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে, যা নিম্ন দক্ষতার শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে, ডেটা বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন ও রোবোটিক্সের মতো উচ্চ দক্ষতার কাজের চাহিদা বাড়বে।
প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে AI কৃষি, স্বাস্থ্য ও সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেশের মোট উৎপাদনে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। তবে, এর জন্য কর্মশক্তির পুনঃপ্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং নীতি স্তরে সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের এখনই স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে কর্মীশক্তি AI চালিত পরিবেশে প্রতিযোগিতামূলক থাকে। পাশাপাশি, সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করে স্বল্পমেয়াদী চাকরির ক্ষতি মোকাবেলা করা জরুরি। এই ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপই ভবিষ্যতে AI এবং শ্রম বাজারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
সারসংক্ষেপে, AI প্রযুক্তি কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা ও ঝুঁকি উভয়ই নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে শ্রম বাজারের বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে বিবেচনা করে, কৌশলগত প্রশিক্ষণ ও নীতি সমর্থন ছাড়া AI এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে। তাই, প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে সমান গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি।



