নতুন সরকার গৃহীত হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে মনোযোগ দেবে কিনা, তা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আজ পর্যন্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা স্পষ্ট, যা সব স্তরের শিক্ষাকে অস্থির অবস্থায় ফেলেছে। এই অস্থিরতা জাতির উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষা সবসময় শাসনকালের রেটোরিক্যাল অগ্রাধিকারে ছিল, তবে বাস্তবিক পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। আসন্ন পার্লামেন্টের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি ও জামায়াত‑ই‑ইসলাম, তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষা উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তবে তা নির্দিষ্ট ভিশন বা সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া কেবল লক্ষ্য তালিকা রূপে রয়ে গেছে।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ফাঁক দীর্ঘদিনের, ফলে নতুন সরকার কীভাবে এই লক্ষ্যগুলোকে বাস্তব রূপে রূপান্তর করবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। বর্তমানে শিক্ষা খাতে কোনো সমগ্র পরিকল্পনা নেই; শুধুমাত্র কিছু উপ-সেক্টরের প্রকল্পই চলমান।
প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (PEDP) এর চতুর্থ পর্যায় বর্তমানে কার্যকর, যা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে কেন্দ্র করে চালু। যদিও এটিকে সেক্টর‑ওয়াইড পদ্ধতি বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে এটি কেবল সরকারী স্কুলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে, ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা বাদ পড়ে।
বেসরকারি ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী শিশুকে শিক্ষা প্রদান করে, তবে তাদের অবস্থা বেশ দুর্বল। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার গুণগত মান ও সম্পদ সীমিত, যা শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।
প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই শিক্ষার শেষ স্তর সম্পন্ন করে, তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়ন দেখায় যে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পাঁচ বছর পরেও মৌলিক পাঠ ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেড শেষ করলেও কার্যকর সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ।
১৯৯০ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং সরকারী নীতি অনুযায়ী সব শিশুকে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এই নীতি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, বিশেষ করে অ-সরকারি ও মাদ্রাসা সেক্টরে।
মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো সার্বজনীন পরিকল্পনা গৃহীত হয়নি। বর্তমানে প্রায় দুই‑তৃতীয়াংশ উপযুক্ত বয়সের শিশু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি, তবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছানো শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। এই স্তরে সম্পন্ন করার হারও নিম্ন, যা উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলে।
শিক্ষা ব্যবস্থার এই বিচ্ছিন্ন অবস্থা ও অপ্রতুল ফলাফল দেখিয়ে দেয় যে, শুধুমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণে নয়, সমগ্র সেক্টরের জন্য একটি সংহত পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন সরকার যদি শিক্ষা সংস্কারের পথে অগ্রসর হতে চায়, তবে প্রথমে একটি সমন্বিত নীতি গঠন, সব ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তি এবং কার্যকরী সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
আপনার সন্তান বা পরিচিত কেউ যদি বর্তমানে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তবে তাদের শিক্ষার গুণগত মান যাচাই করা, বাড়িতে মৌলিক পাঠ ও গণিতের অনুশীলন নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার মতামত কী? আপনি কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে অবদান রাখতে চান?



