ডেভোসের শীতকালীন শীর্ষ সম্মেলনের তৃতীয় দিনে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন “বোর্ড অফ পিস” উন্মোচন করে এবং ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন। এই উদ্যোগটি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক গ্রিনল্যান্ড সম্পর্কিত হুমকি প্রত্যাহার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর আরোপিত শুল্ক বাতিলের পরপরই প্রকাশিত হয়েছে।
গত বুধবার ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা করে নিতে সামরিক হুমকি তুলে নেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপের ওপর ধার্য শুল্ক বাতিলের ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনের পরিবেশে উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করেছে এবং ট্রাম্পকে শান্তি প্রচারকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ তৈরি করেছে।
ডেভোসে তার দ্বিতীয় দিনেই ট্রাম্প “বোর্ড অফ পিস”-এর চার্টার স্বাক্ষরের অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। বোর্ডের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বিরোধ সমাধান করা, এবং এর প্রতিষ্ঠা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক করা হবে। এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে আলাপ করবেন এবং বোর্ডের কাঠামো ও কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করবেন।
বোর্ডের স্থায়ী সদস্যপদে এক বিলিয়ন ডলার মূল্য নির্ধারিত হয়েছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেটান্যাহু এবং হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের মতো নেতাদের অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এছাড়া মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল-সিসি এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নেতারাও এই উদ্যোগে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোর্ডকে “এখন পর্যন্ত গঠিত সর্বশ্রেষ্ঠ বোর্ড” বলে উল্লেখ করে, আল-সিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এই সংস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আল-সিসি ইতিমধ্যে বোর্ডের সদস্যপদ গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা বোর্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়াতে সহায়তা করবে।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পেছনে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ফলে সৃষ্ট হতাশা রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তিনি পূর্বে আটটি সংঘাত সমাধানে নিজেকে ভূমিকা রাখার দাবি করে আসছেন, যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এই দাবির স্বীকৃতি সীমিত।
প্রাথমিকভাবে গাজা অঞ্চলের পুনর্নির্মাণ তত্ত্বাবধানের জন্য বোর্ডের ধারণা করা হয়েছিল, তবে চুক্তির ধারা গাজা সীমাবদ্ধ নয় এবং বিশ্বব্যাপী সংঘাত সমাধানে এর ভূমিকা বিস্তৃত করা হয়েছে। এই বিস্তৃত দায়িত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্র, বিশেষ করে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য, বোর্ডকে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, বিশেষ করে সউদি আরব এবং কাতার, ইতিমধ্যে বোর্ডে যোগদানের ইচ্ছা জানিয়েছে। মোট প্রায় পঞ্চাশটি আমন্ত্রণের মধ্যে থেকে এখন পর্যন্ত ত্রিশ পাঁচটি দেশ চূড়ান্তভাবে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই সংখ্যা বোর্ডের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে, যদিও কিছু পশ্চিমা মিত্রের সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের উদ্বেগের কারণ। পুতিনের অফিসিয়াল মন্তব্যে তিনি এখনও আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন, তবে ট্রাম্পের দলে পুতিনের সম্মতি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিতে নতুন জটিলতা যোগ করেছে।
ডেভোসে এই নতুন সংস্থার উদ্বোধন ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বোর্ডের কার্যক্রম কীভাবে গ্লোবাল শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং তা কি জাতিসংঘের ভূমিকা হ্রাস করবে, তা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে ঘনিষ্ঠ নজরে থাকবে।



