যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরের সমাপ্তি চিহ্নিত করে ২০ জানুয়ারি একটি দীর্ঘ ভাষণ প্রদান করেন। বক্তৃতায় তিনি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন, যার মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি শূন্য, ওষুধের দাম শতকরা ৬০০ পর্যন্ত হ্রাস এবং কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে বিশাল সাফল্য অন্তর্ভুক্ত। তবে আল-জাজিরার বিশেষ তথ্য যাচাই প্রতিবেদনের অনুসারে, এই দাবিগুলো সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখায়।
ট্রাম্পের মুদ্রাস্ফীতি সংক্রান্ত মন্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো (BLS) প্রকাশিত তথ্যের তুলনা করা হলে স্পষ্ট হয় যে, তিনি গত ত্রৈমাসিকের মূল মুদ্রাস্ফীতি ১.৬ শতাংশের নিচে থাকার দাবি করেন, যেখানে BLS জানিয়েছে যে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে মূল মুদ্রাস্ফীতি যথাক্রমে ২.৬ শতাংশ এবং সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি ২.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেন যে, এই পার্থক্যটি কেবলমাত্র সংখ্যাত্মক নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিফলিত করে না।
ওষুধের দামের হ্রাস সম্পর্কেও ট্রাম্পের বক্তব্যকে বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন যে তার “সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ” উদ্যোগের ফলে ওষুধের দাম ৩০০ থেকে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। তবে কোনো পণ্যের দাম ১০০ শতাংশ কমে গেলে তা বিনামূল্যে হয়ে যায়, আর তার বেশি হ্রাসের অর্থ হবে বিক্রেতা গ্রাহকের কাছে টাকা দিচ্ছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। বিশ্লেষকরা বলেন, ওষুধের দামের পরিবর্তন সম্পর্কে সরকারি তথ্যের সঙ্গে ট্রাম্পের উপস্থাপিত সংখ্যা মেলেনা।
শুল্ক নীতি সংক্রান্ত ট্রাম্পের মন্তব্যও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। তিনি সুপ্রিম কোর্টে চলমান শুল্ক মামলার রায়কে আংশিকভাবে স্বীকার করেন, তবে আদালত যে রায় দিয়েছে তা সম্পূর্ণ শুল্কের ফেরত নয়, বরং সংগ্রহিত শুল্কের অর্ধেকের কাছাকাছি পরিমাণ আমদানিকারকদের ফেরত দিতে হতে পারে, যা অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট পূর্বে উল্লেখ করেছিলেন। এই বিষয়টি ট্রাম্পের বক্তৃতায় যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি।
কর্মসংস্থান ক্ষেত্রেও তার দাবিতে অসঙ্গতি দেখা যায়। ট্রাম্প ২০২৫ সালে তার প্রশাসন ২,৭০,০০০ের বেশি সরকারি কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে বলে উল্লেখ করেন, তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন যে এই কর্মচারীরা বেসরকারি খাতে সহজে কাজ পেয়েছে। BLS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৫,৮৪,০০০ নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তুলনামূলকভাবে, বাইডেন প্রশাসনের শেষ বছরে প্রায় ২০ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। এই পার্থক্য ট্রাম্পের কর্মসংস্থান সাফল্যের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গাড়ি কারখানা নির্মাণের বিষয়ে ট্রাম্পের উল্লিখিত পরিকল্পনাও বিশেষজ্ঞদের মতে অতিরঞ্জিত। তিনি উল্লেখ করেন যে তার নীতি অনুসরণে দেশীয় গাড়ি উৎপাদন বাড়বে, তবে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের অভাবের কারণে এই লক্ষ্য অর্জন এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের এই ধরনের অর্থনৈতিক দাবিগুলো তার সমর্থকদের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে এবং পরবর্তী নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে ধারাবাহিক বিরোধের ফলে তার নীতি ও বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার প্রশাসনের অবস্থানকে প্রভাবিত করবে।
অধিকন্তু, এই তথ্য যাচাইয়ের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে ট্রাম্পের প্রশাসন যদি এই ধরনের দাবিগুলোকে বাস্তব ডেটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে না, তবে তা রাজনৈতিক বিরোধিতা ও আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, আল-জাজিরার তথ্য যাচাই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেখা যায়, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক বিষয়ে করা বেশিরভাগ দাবি সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মেলেনা। মুদ্রাস্ফীতি, ওষুধের দাম, শুল্ক রায় এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত তার উপস্থাপিত সংখ্যা ও বাস্তব পরিসংখ্যানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নীতি ও নির্বাচনী কৌশলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে জনমত গঠনে তথ্যের নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব পুনরায় জোরদার করে।



