শেরপুরের গারো পাহাড়ের সীমান্তে রঙিন গোলাপের বাণিজ্যিক চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা দৈনিক ঢাকার ফুলবাজারে তাজা পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন দিক তৈরি করছে।
মেঘালয় রাজ্যের শীতকালে দীর্ঘমেয়াদী শীত ও বৃষ্টিপাতের প্রভাব শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে, যা গোলাপের চাষের জন্য আদর্শ শর্ত প্রদান করে।
রাজশাহী থেকে আগত আছির উদ্দিন নামের এক চা বাগান মালিক, ৪৩ শতাংশ নিজস্ব জমি এবং সমপরিমাণ লিজকৃত জমিতে তিন বছর ধরে বিভিন্ন রঙের গোলাপ চাষ শুরু করেন। তার উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চমানের ফুল উৎপাদন করে রাজধানীর বাজারে সরবরাহ করা।
আছিরের সফলতা শেরপুরের অন্যান্য কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঝিনাইগাতীর সন্ধ্যাকুড়া গ্রামে মোহাম্মদ আলী ২০২১ সালে এক একর জমিতে বাণিজ্যিক গোলাপ চাষ শুরু করেন এবং তার উৎপাদন নিয়মিত শাহবাগ ফুলবাজারে পাঠান।
মোহাম্মদ আলীর বাগান দ্রুত বৃদ্ধি পায়; বর্তমানে প্রায় বিশ হাজার গাছের মধ্যে থেকে দৈনিক গড়ে দুই হাজারটি ফুল সংগ্রহ করে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বিক্রি হয়। মৌসুমভেদে একটি ফুলের বিক্রয়মূল্য দশ থেকে পঁচিশ টাকার মধ্যে পরিবর্তিত হয়।
আছিরের বাগানও সম্প্রসারিত হয়ে দুইটি সাইটে মোট অর্ধেক হেক্টর জমিতে প্রায় আটারো হাজার গাছের সমন্বয়ে গঠিত। তিনি ভারত থেকে টিস্যু কালচার করা চীনা গোলাপের চারা ব্যবহার করে মাটি ও পানির গুণগত মান পরীক্ষা করে বাগান স্থাপন করেন। বর্তমানে তার বাগান থেকে দৈনিক এক হাজার দুইশ থেকে এক হাজার পাঁচশটি ফুল ঢাকা বাজারে পৌঁছে।
মোহাম্মদ আলীর সাফল্য দেখেই রাংটিয়া, সন্ধ্যাকুড়া ও ঘোমরা এলাকায় অন্তত তেরজন কৃষক বাণিজ্যিক গোলাপ চাষে যুক্ত হয়েছেন। প্রতিটি গাছ দশ থেকে পনেরো বছর পর্যন্ত ফুল উৎপাদন করে, তবে নিয়মিত সেচ, সার ও কীটনাশকের খরচ বজায় রাখতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়।
রাংটিয়া এলাকায় ৩৫ শতাংশ জমিতে আবদুস সালাম ও তার স্ত্রী সুফিয়া বেগম গোলাপ চাষ করছেন। তারা প্রতিদিন তিনশ থেকে চারশটি ফুল শেরপুরের শহরে বিক্রি করে এবং ভবিষ্যতে বাগানকে আরও বড় করার পরিকল্পনা করছেন।
এই অঞ্চলের গোলাপ চাষের দ্রুত বিস্তার স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়িয়ে তুলেছে। তাজা গোলাপের ধারাবাহিক সরবরাহ ঢাকার ফুলবাজারে মৌসুমী ঘাটতি কমিয়ে দেয় এবং বিক্রয়মূল্যকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখে। ফলে শেরপুরের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
তবে উচ্চপ্রাথমিক বিনিয়োগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং আবহাওয়ার অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ব্যবসার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। মাটির পিএইচ, পানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা না থাকলে উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে।
বাজারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণগত মান বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো এবং ফুলের প্যাকেজিং, সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়ন ভবিষ্যতে লাভের মার্জিন বাড়াতে পারে। এছাড়া, রপ্তানি সম্ভাবনা অনুসন্ধান ও স্থানীয় পর্যটন সংযোগের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, গারো পাহাড়ের অনুকূল জলবায়ু ও উদ্যোক্তাদের উদ্যোগের সমন্বয়ে রঙিন গোলাপের বাণিজ্যিক চাষ শেরপুরের অর্থনৈতিক কাঠামোতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বাজার বিশ্লেষণের সুষম পরিকল্পনা প্রয়োজন।



