যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার সামাজিক মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড ও পুরো আর্কটিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ চুক্তির একটি প্রাথমিক কাঠামো গঠনের কথা জানিয়ে দিলেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ত্যাগ করার সিদ্ধান্তও প্রকাশ করেন। এই ঘোষণার পেছনে ন্যাটো শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার জন্য এই আলোচনার গুরুত্ব ট্রাম্প জোর দিয়ে তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের মতে, ন্যাটো প্রধানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিকের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে এবং উভয় পক্ষের স্বার্থকে সমন্বয় করে একটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা তৈরি হয়েছে। তিনি এই কাঠামোকে “অত্যন্ত ফলপ্রসূ” বলে বর্ণনা করেন এবং এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর জন্য উপকারী বলে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের সত্য সোশ্যাল পোস্টে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে গ্রিনল্যান্ড এবং পুরো আর্কটিক অঞ্চলের জন্য একটি ভবিষ্যৎ চুক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন যে আলোচনার অগ্রগতি অনুযায়ী অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার করা হবে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পূর্বে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি প্রত্যাহার করার কথা জানিয়ে দেন।
ব্রিটেনের ডেভস শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্প পূর্বে উল্লেখ করেন যে তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিশ্চিত করতে চান। তিনি যুক্তি দেন যে এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য এবং তাই কূটনৈতিক পথেই সমাধান খুঁজতে ইচ্ছুক।
চুক্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে সরাসরি ট্রাম্পের কাছে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। উভয় কর্মকর্তার ভূমিকা চুক্তির শর্তাবলী চূড়ান্ত করা এবং ডেনমার্কের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করা। এই ব্যবস্থা ট্রাম্পের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আলোচনার গতি বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী লার্স লেক্কে রাসমুসেনের মন্তব্যে তিনি বলেন, দিনের শেষের দিকে পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে ডেনমার্কের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য একটি সমঝোতা খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা জোর দেন। রাসমুসেনের মতে, এখন উভয় পক্ষকে টেবিলে বসে পারস্পরিক স্বীকৃত সীমা নির্ধারণ করা উচিত।
বৈঠকের পরপরই কিছু বিশদ তথ্য প্রকাশ পায়। ট্রাম্পের সিএনবিসি সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন যে সম্ভাব্য চুক্তি দীর্ঘমেয়াদী হবে এবং এতে খনিজ অধিকারসহ বিভিন্ন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তিনি বিশেষভাবে “গোল্ডেন ডোম” নামে পরিচিত একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উল্লেখ করেন, যা ভূমি, সমুদ্র ও মহাকাশে বিস্তৃত সনাক্তকারী ও বাধা ব্যবস্থা নিয়ে গঠিত হবে।
গোল্ডেন ডোম প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল দীর্ঘ দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করা। এই ব্যবস্থা আর্কটিকের উপরে একটি বিস্তৃত রাডার ও ইন্টারসেপ্টর নেটওয়ার্ক স্থাপন করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তা জোরদার করবে। ট্রাম্পের মতে, এই ধরণের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গ্রিনল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
গ্রিনল্যান্ডের ভূগোলিক অবস্থান ও বিশাল ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিরল ধাতু ও ভূমি-দুর্লভ ধাতু, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের দল এই সম্পদগুলোকে মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির মূল উপাদান হিসেবে উল্লেখ করে, যা চুক্তির আর্থিক দিককে শক্তিশালী করে।
ডেভসের সমাবেশে ট্রাম্পের সিএনএন সাক্ষাৎকারের পর তিনি সিএনএনকে জানিয়ে বলেন যে চুক্তিটি “চিরকাল স্থায়ী” হবে এবং এতে উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিস্তৃত ব্যবস্থা থাকবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের সীমানা রক্ষার জন্য পারস্পরিক সম্মতি প্রয়োজনীয় বলে জোর দেন।
এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিবেশে নতুন গতিবিধি দেখা যাবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনার ফলাফল ভবিষ্যতে আর্কটিকের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করবে।
পরবর্তী ধাপে ট্রাম্পের দল ডেনমার্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তাবলী নির্ধারণের জন্য বিশেষ দল গঠন করবে। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা পরবর্তী সপ্তাহে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে অগ্রগতি শেয়ার করার পরিকল্পনা করেছে। চুক্তি চূড়ান্ত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে আর্কটিক অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে।



