ব্র্যান্ডেনের ডিডব্লিউ স্টুডিওতে ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় সিনেমা রাউন্ডটেবলে চারজন স্বনামধন্য পরিচালক চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক দিক, ট্রমার প্রভাব এবং বড় পর্দার গুরুত্ব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। এই সমাবেশটি দ্য হলিভুড রিপোর্টার, জার্মান সম্প্রচার DW এবং ইউরোপীয় ফিল্ম একাডেমি যৌথভাবে আয়োজন করেছে এবং “European Cinema on the Edge” শিরোনামে পরিচিত।
আলোচনায় অংশ নেন নরওয়ের তরুণ পরিচালক জোয়াকিম ট্রিয়ের, জার্মানির মাশা শিলিনস্কি, স্পেনের অলিভার ল্যাক্স এবং ইরানের জাফার পানাহি। প্রত্যেকের কাজ গত বছরের সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যা পুরস্কার মৌসুমের আলোচনার বাইরে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
ট্রিয়ের তার নরম নরওয়েজিয়ান মেলোড্রামা “Sentimental Value” নিয়ে উপস্থিত ছিলেন, যেখানে পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতা ও সামাজিক পরিবর্তনকে সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। শিলিনস্কি তার শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত জার্মান ঐতিহাসিক মহাকাব্য “Sound of Falling” নিয়ে আলোচনা করেন, যা সময়ের প্রবাহে মানবিক অভিজ্ঞতার পরিবর্তনকে তুলে ধরে।
ল্যাক্সের স্প্যানিশ ডিস্টোপিয়ান রোড মুভি “Sirât” একটি স্বপ্নময় ও অদ্ভুত দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতা প্রকাশ করে। পানাহির ইরানি নৈতিক থ্রিলার “It Was Just an Accident” ফ্রান্সের ওসকার রেসে প্রতিনিধিত্ব করে এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রে রাখে।
চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্নে, পরিচালকরা একমত যে সিনেমা স্বভাবতই কোনো না কোনো রূপে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, যদিও তা কখনও কখনও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়। তারা উল্লেখ করেন যে, চলচ্চিত্র নির্মাতারা সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সেতু গড়ে তোলার দায়িত্বে আছেন।
ট্রিয়ের তার পেশাগত পথের সূচনা সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, তিনি একসময় পেশাদার স্কেটবোর্ডার ছিলেন এবং তৃতীয় প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার দাদি চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন, আর বাবা সাউন্ড ডিজাইনার এবং মা ডকুমেন্টারি পরিচালিকায় কাজ করেন; এই পারিবারিক পরিবেশ তার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে গঠন করেছে।
শিলিনস্কি উল্লেখ করেন যে, তার ঐতিহাসিক নাটকটি সময়ের স্তরগুলোকে একত্রিত করে মানবিক সংযোগের ধারাবাহিকতা তুলে ধরতে চেয়েছে, যা বর্তমানের সামাজিক বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ল্যাক্সের কাজের ক্ষেত্রে তিনি স্বপ্নময় ভিজ্যুয়াল শৈলীর মাধ্যমে আধুনিক জীবনের অস্থিরতা ও বিচ্ছিন্নতা প্রকাশের চেষ্টা করেন।
পানাহি তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নৈতিক জটিলতা ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন তুলে ধরেন, যা দর্শকদের আত্মবিশ্লেষণের দিকে ধাবিত করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বড় পর্দায় সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা এখনও দর্শকের সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করে, যদিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান ঘটেছে।
আলোচনার শেষে, চারজন পরিচালক একমত হন যে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ট্রমা ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বোঝা সম্ভব, এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। তারা চলচ্চিত্রকে সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন, যা দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সক্ষম।
এই রাউন্ডটেবিলের মূল লক্ষ্য ছিল পুরস্কার মৌসুমের গৌরবের বাইরে গিয়ে সিনেমার মৌলিক ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে চিন্তা করা। অংশগ্রহণকারীরা শিল্পের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, নৈতিক দায়িত্ব এবং দর্শকের সঙ্গে সংযোগের নতুন পদ্ধতি নিয়ে মতবিনিময় করেন।
সিনেমা প্রেমিকদের জন্য এই আলোচনা একটি মূল্যবান দৃষ্টান্ত, যা দেখায় কীভাবে চলচ্চিত্র সমাজের গভীর সমস্যাগুলোকে আলোকিত করতে পারে। ভবিষ্যতে এমন সমাবেশের মাধ্যমে শিল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও সমৃদ্ধ আলোচনা আশা করা যায়।
চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী পাঠকদের পরামর্শ, এই চারজন পরিচালকের কাজগুলো ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করা এবং তাদের চলচ্চিত্রগুলো বড় পর্দায় উপভোগ করা, যাতে সিনেমার প্রভাব ও বার্তা পূর্ণভাবে অনুভব করা যায়।



