ডেভোস, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘন্টারও বেশি সময় ধরে বিশ্বনেতাদের সামনে বক্তব্য রাখেন। বক্তৃতায় তিনি গ্রীনল্যান্ডের অধিগ্রহণ, ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অংশ এবং চীনে বায়ু শক্তি সম্পর্কে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেন। এই দাবিগুলোর সত্যতা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের অংশ বলে দাবি করেন এবং এটিকে “একটি ছোট চাহিদা” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্ককে ফেরত দেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এই মন্তব্য গ্রীনল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
গ্রীনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের ইতিহাস ১৯৩৩ সালের একটি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ডেনমার্কের অধীনে নিশ্চিত হয়। সেই রায়ের পর গ্রীনল্যান্ডের কোনো দেশীয় পরিবর্তন ঘটেনি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত করেছে।
১৯৪১ সালে ডেনমার্কের জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল নাজি জার্মানির আক্রমণ থেকে গ্রীনল্যান্ডকে রক্ষা করা এবং কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করা।
চুক্তিতে গ্রীনল্যান্ডের ভূখণ্ডগত স্বায়ত্তশাসন পরিবর্তনের কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল না; ফলে গ্রীনল্যান্ড কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সৈন্যবাহিনী গ্রীনল্যান্ডে স্থাপিত হলেও তা কেবল রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ছিল, স্বত্ব হস্তান্তরের নয়।
ট্রাম্প ন্যাটোকে সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০০% ন্যাটো ব্যয়ের দায়িত্ব বহন করছে। তিনি সদস্য দেশগুলোর ২% জিডিপি ব্যয় লক্ষ্য পূরণ না করা এবং এখন ৫% পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি তুলে ধরেন। এই বক্তব্য ন্যাটোর আর্থিক কাঠামোকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে।
বাস্তবে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর সামগ্রিক রক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৭০% যুক্তরাষ্ট্রের অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অনুপাত হ্রাস পেয়ে ২০২৪ সালে ৬৫% এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৬২% পৌঁছেছে। এই হ্রাসের পেছনে অন্যান্য সদস্য দেশের ব্যয় বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আপেক্ষিক ব্যয় হ্রাস রয়েছে।
ন্যাটো সকল সদস্যকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপির কমপক্ষে ২% রক্ষা ব্যয় করতে বাধ্য করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ইউরোপীয় দেশগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার স্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।
ট্রাম্পের “যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর ১০০% ব্যয় বহন করছে” এবং “সদস্য দেশগুলো এখন ৫% ব্যয় করবে” বলে উল্লিখিত দাবি বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ন্যাটোর আর্থিক কাঠামোতে প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব ব্যয় ভাগ করে, এবং ২% লক্ষ্য পূরণে সকলেরই অবদান প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষা ব্যয় এখনও ন্যাটোর মধ্যে সর্বোচ্চ, তবে তা পুরো ব্যয়ের অর্ধেকের কাছাকাছি নয়। অন্যান্য সদস্য দেশগুলোও সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে ন্যাটোর সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্য এই পরিবর্তনকে উপেক্ষা করে একতরফা ব্যাখ্যা দেয়।
ডাভোসে ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়েছে। গ্রীনল্যান্ডের স্বত্ব ও ন্যাটো ব্যয়ের প্রকৃত পরিসংখ্যানের ভুল উপস্থাপন দেশীয় ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো নীতি ও গ্রীনল্যান্ড সম্পর্কিত কূটনৈতিক আলোচনার দিকনির্দেশনা এই বিতর্কের প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে।



