বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রার্থীরা সকালের সঙ্গে সঙ্গে রোডশো, সভা ও ঘনিষ্ঠ আলোচনায় লিপ্ত হয়েছে। তবে ইলেকশন কমিশনের নির্ধারিত আচরণবিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক, ফলে প্রচারণার বেশ কয়েকটি দিক সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইসির আচরণবিধি স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে যে, প্রার্থী তার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা, গোষ্ঠী বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো ধরণের চাঁদা, অনুদান বা উপহার গ্রহণ করতে পারবে না, এমনকি ভবিষ্যতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়াও অনুমোদিত নয়। একই সঙ্গে কোনো সংস্থা, সমিতি বা সংগঠন থেকে সমাবেশ, খাবার বা অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না।
সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সম্পদ ব্যবহারেও কঠোর সীমা আরোপ করা হয়েছে। প্রার্থীকে রাজস্ব বা উন্নয়ন তহবিলের আওতায় থাকা কোনো প্রকল্পের অনুমোদন, ঘোষণাপত্র বা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, ফলক উন্মোচন ইত্যাদি কার্যক্রমে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি ডাকবাহিনীর গাড়ি, রেস্ট হাউজ, সার্কিট হাউজ বা কোনো সরকারি অফিসের সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।
প্রতিপক্ষের জনসভা, শোভাযাত্রা বা অন্যান্য প্রচারমূলক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা, ভীতি প্রদর্শন করা বা কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে, প্রার্থীর নিজস্ব সভা-সমাবেশের সময়, স্থান ও তারিখ রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে এবং কমপক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা আগে স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করতে হবে।
সড়ক, মহাসড়ক ও জনপথে এমন কোনো সমাবেশ করা যাবে না যা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। দেশের বাইরে কোনো প্রকার জনসভা বা প্রচারণা চালানোও অনুমোদিত নয়, ফলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকবে।
এই নির্বাচনে ইসির প্রথম উদ্যোগ হিসেবে পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাগজ, প্লাস্টিক বা অন্য কোনো উপাদানে তৈরি পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার আর অনুমোদিত নয়। বিশেষ করে, অগ্নি-সংশ্লিষ্ট বা দাহ্য উপাদান দিয়ে তৈরি প্রচার সামগ্রী ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
প্রচার সামগ্রীকে দালান, দেয়াল, গাছ, বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনাসমূহ, বাস, ট্রাক, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ, রিকশা, অটোরিক্সা, লেগুনা, ট্যাক্সি, বেবিটেক্সি ইত্যাদি যেকোনো যানবাহনে লাগানো যাবে না। এই নিষেধাজ্ঞা প্রার্থীদের প্রচার কৌশলকে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমের দিকে সরিয়ে দেবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ফেস্টুন, ব্যানার বা বিলবোর্ডের উপর নিজের সামগ্রী টাঙ্গানো, অথবা সেগুলোর ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের কাজের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে শাস্তি দেওয়া হবে।
ইসির নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত ব্যানার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের রঙ কেবল সাদা-কালো হতে পারবে, রঙিন সামগ্রী অনুমোদিত নয়। এই নিয়মের লক্ষ্য হল প্রচার সামগ্রীর ভিজ্যুয়াল প্রভাব কমিয়ে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
প্রতিপক্ষের দলগুলো এই নতুন বিধানকে স্বাগত জানিয়েছে, যদিও তারা উল্লেখ করেছে যে পোস্টার ও রঙিন সামগ্রী ছাড়া গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকায় ভোটারদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। তবুও, ইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সকল প্রার্থীকে সমান শর্তে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেওয়া হবে এবং কোনো লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি আরোপ করা হবে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে ইসির তদারকি দলগুলো নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত থাকবে, যাতে আচরণবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করা যায়। লঙ্ঘনকারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং জরুরি শাস্তি আরোপ করা হবে। এই কঠোর নিয়মাবলী নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রচারাভিযানের এই নতুন সীমাবদ্ধতা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের পদ্ধতিকে পরিবর্তন করবে, বিশেষত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়বে। তবে, ইসির নির্দেশনা অনুসারে, প্রার্থীদের উচিত আইন মেনে চলা এবং ভোটারদের সঠিক তথ্য প্রদান করা, যাতে নির্বাচনের ফলাফল জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন হয়।



