যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত কারাগার থেকে ইস্লামিক স্টেট (আইএস) গোষ্ঠীর প্রায় ৭,০০০ বন্দীকে ইরাকে স্থানান্তর করার একটি মিশন চালু করেছে। এই পদক্ষেপটি সিরিয়ার সরকারী বাহিনী কুর্দি নেতৃত্বাধীন সুরক্ষামূলক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করার পর নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হল বন্দীদের পালিয়ে যাওয়া রোধ করে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সরাসরি হুমকি কমানো।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মতে, ইতিমধ্যে হ্যাসাকাহ প্রদেশের এক কারাগার থেকে ১৫০টি আইএস বন্দীকে নিরাপদে ইরাকের একটি স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই স্থানান্তরকে “ব্রেকআউট প্রতিরোধ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সিরিয়ার সরকার মঙ্গলবার রাতে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) সঙ্গে নতুন একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। এই চুক্তি এসডিএফের আল-হোল শিবির থেকে প্রত্যাহারের পর আসে, যেখানে হাজারো আইএস যোদ্ধার আত্মীয়-স্বজন আটক রয়েছে। শিবিরের অবস্থা এবং বন্দীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ফলে এই যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সপ্তাহে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় যে হ্যাসাকাহের কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কুর্দি বাহিনীর একটি ড্রোন আক্রমণে সাতজন সৈন্য নিহত হয়েছে। এই ঘটনা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন্দী স্থানান্তর পরিকল্পনার জরুরি প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
শাদ্দাদি কারাগার থেকে আইএস সন্দেহভাজনদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা পূর্বে এসডিএফ ও সিরিয়ার সরকারী বাহিনীর মধ্যে তীব্র বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় সোমবার রাতে জানায় যে, প্রায় ১২০ জন আইএস সন্ত্রাসী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর বিশেষ বাহিনী ও সেনা শহরে প্রবেশ করে। অনুসন্ধানমূলক অপারেশনে ৮১ জন পালিয়ে যাওয়া অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এসডিএফের মতে, শাদ্দাদি কারাগার নিয়ন্ত্রণের হারিয়ে যাওয়া ঘটনার পরে দমাস্কাস-সম্পর্কিত গোষ্ঠীগুলি একাধিক আক্রমণ চালায় এবং তাদের বহু যোদ্ধা নিহত হয়। এসডিএফের মুখপাত্র ফারহাদ শামী জানান, এই সংঘর্ষে প্রায় ১,৫০০ জন আইএস সদস্য পালিয়ে গেছে। একই সঙ্গে, সিরিয়ার সরকারী বাহিনীর আক্রমণ রাক্কা শহরের উত্তরে আল-আকতান কারাগারেও ঘটেছে, যেখানে আইএস সদস্য ও নেতারা আটক রয়েছে।
আইএস গোষ্ঠী সিরিয়ায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ২০২৫ সালে উত্তর-পূর্বে কুর্দি-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবশিষ্ট হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যখন আইএস বন্দীদের নিরাপদে স্থানান্তর করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র পূর্বে সিরিয়ার এসডিএফের প্রধান মিত্র ছিল এবং ২০২৫ সালে দু’পাশের সহযোগিতা বিভিন্ন সামরিক ও মানবিক প্রকল্পে প্রসারিত হয়। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে সিরিয়ার সরকারী বাহিনীর কুর্দি অঞ্চল পুনরুদ্ধার, এই পারস্পরিক সম্পর্ককে পুনর্গঠন করার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বন্দী স্থানান্তর মিশনটি কেবল আইএসের পুনরায় সংগঠনের সম্ভাবনা কমায় না, বরং সিরিয়ার সরকার ও কুর্দি গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান উত্তেজনা হ্রাসের একটি কূটনৈতিক সেতু হিসেবেও কাজ করতে পারে। এই প্রক্রিয়ার সফলতা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং অঞ্চলের বৃহত্তর নিরাপত্তা গঠনে প্রভাব ফেলবে।
একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল গতি-প্রকৃতির মধ্যে একটি সতর্ক সমন্বয়, যা আইএসের অবশিষ্ট ক্ষমতা সীমিত করতে এবং সিরিয়ার সরকারী ও কুর্দি শক্তির মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে লক্ষ্য রাখে।”
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর আরও বন্দী স্থানান্তর এবং সিরিয়ার সরকারী বাহিনীর কারাগার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণকে মূল মাইলস্টোন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে, সিরিয়ার সরকার ও এসডিএফের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং মানবিক শিবিরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।



