বাংলাদেশ ব্যাংকের গার্হস্থ্য গভার্নর আহসান এইচ. মানসুর সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ব্যাংকিং সেক্টর: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংকিং কাঠামোকে পুনর্গঠন করার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে মোট ৬১টি ব্যাংক রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত। তিনি ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংকই যথেষ্ট হবে বলে ধারণা প্রকাশ করেন এবং এধরনের হ্রাসের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়বে বলে আশাবাদী হন।
গভার্নর মানসুরের মতে, অপরাধমূলক কার্যকলাপ, অনিয়ম, পারিবারিক আধিপত্য এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা ব্যাংকিং সেক্টরের অবনতির প্রধান কারণ। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংকিং সেক্টর থেকে বেরিয়ে গেছে, যার বেশিরভাগ সম্ভবত বিদেশে লন্ডার করা হয়েছে। তদুপরি, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার সেক্টর থেকে চুরি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গভার্নর জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা উচিত নয়। তিনি উল্লেখ করেন, শাসনব্যবস্থার অভাবে সেক্টরটি ধসে পড়েছে এবং সব দিক থেকে সংস্কার জরুরি। নন-পারফরমিং লোন (এনপিএল) সংক্রান্ত বিষয়েও তিনি আশাবাদী, জানিয়ে দেন যে মার্চের মধ্যে ডিফল্ট হার ২৫ শতাংশে নামবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, যদি সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার কার্যকর না হয়, তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পুনরায় সেক্টরে ফিরে আসতে পারে।
ব্যাংক রেজোলিউশন ফান্ড গঠনের কাজও বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে চালিয়ে যাচ্ছে। এই ফান্ডের লক্ষ্য ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০ কোটি টাকার মধ্যে সংগ্রহ করা, যা শুধুমাত্র ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনকেও অন্তর্ভুক্ত করবে। ফান্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।
মার্কিন ডলার লেনদেনের পরিবর্তে নগদ ব্যবহারের ওপর গভার্নর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, নগদই রাজস্ব হ্রাসের প্রধান মাধ্যম, এবং নগদবিহীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বার্ষিক রাজস্ব সংগ্রহে ১.৫ থেকে ২ লক্ষ কোটি টাকার অতিরিক্ত বৃদ্ধি সম্ভব। এই লক্ষ্যে তিনি শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার গুরুত্ব উল্লেখ করেন, যাতে প্রত্যেক ছাত্রের আর্থিক লেনদেন স্বচ্ছ ও নিরাপদ হয়।
আলোচনার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. রেজাউল করিমও বর্তমান ব্যাংকিং পরিবেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে মতামত প্রকাশ করেন। তিনি গভার্নরের প্রস্তাবকে সমর্থন করে বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরের কাঠামোগত সংস্কার দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গার্হস্থ্য গভার্নর আহসান এইচ. মানসুরের প্রস্তাব দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রেখে বাকি সবকে একত্রিত করার, ব্যাংকিং সেক্টরের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার এবং নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার দিকে কেন্দ্রীভূত। এই পদক্ষেপগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সুনাম উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।



