ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা জাতিসংঘের সমর্থন পেয়েছে, তার কার্যক্রমে তীব্র বিতর্ক দেখা দিচ্ছে। সংস্থার নির্বাহী বোর্ডে যুক্ত হয়েছে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, যিনি ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণকে সমর্থন করার জন্য সমালোচিত। এছাড়া, স্থায়ী সদস্যপদের জন্য এক বিলিয়ন ডলারের ফি নির্ধারণ, এবং সংস্থার মধ্যে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
সংস্থার সদস্যপদে যোগদানের জন্য ট্রাম্পের দল ইতিমধ্যে কয়েক ডজন দেশের শীর্ষ নেতাদের চিঠি পাঠিয়েছে। তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোডুলিডেস, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ এল‑সিসি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন, গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস, জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নওরোকি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তর্ভুক্ত।
নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সনকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং তিনি এই প্রস্তাবটি “যথাযথ বিবেচনা” করবেন বলে জানিয়েছেন। থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সংস্থার প্রস্তাবের বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে।
এ পর্যন্ত যেসব নেতারা আমন্ত্রণ গ্রহণের কথা প্রকাশ করেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডি রামা, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম‑জোমার্ট টোকায়েভ, প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা, উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োভ। এছাড়া ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক টো লামও এই প্রস্তাব গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
বিতর্কের মূল কারণগুলোর একটি হল টনি ব্লেয়ারের অংশগ্রহণ, যাকে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের সমর্থনের জন্য আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে দাঁড়াতে হয়েছে। তার উপস্থিতি সংস্থার মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, এক বিলিয়ন ডলারের ফি নির্ধারণকে কিছু বিশ্লেষক ‘অর্থনৈতিক শর্তের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। এই শর্তটি সংস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগও তীব্র। সংস্থার প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রমে জাতিসংঘের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, কিছু দেশ এই সংস্থাকে জাতিসংঘের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে কাজ করার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে, যা আন্তর্জাতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
প্রতিবাদী দেশগুলো সংস্থার গঠন ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আর্থিক স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রমে রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থের অপ্রকাশ্য প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বিরোধ সৃষ্টি করে।
এই প্রস্তাবের স্বীকৃতি ও প্রত্যাখ্যানের ফলে গ্লোবাল রাজনৈতিক দৃশ্যপটের উপর প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যদি বৃহৎ শক্তিগুলো এই সংস্থায় অংশগ্রহণ করে, তবে গাজা শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন গতিপথ তৈরি হতে পারে; অন্যদিকে, যদি প্রধান দেশগুলো প্রত্যাখ্যান করে, তবে সংস্থার কার্যকারিতা ও বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
ট্রাম্পের প্রশাসন এই সংস্থাকে গাজা অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি অর্জনের জন্য একটি ‘মধ্যস্থ’ মেকানিজম হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনও অনিশ্চিত।
পরবর্তী ধাপে, আমন্ত্রিত দেশগুলোর সরকারগুলো তাদের নিজস্ব কূটনৈতিক পর্যালোচনা শেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত জানাবে। একই সঙ্গে, সংস্থার শাসন কাঠামো, আর্থিক মডেল এবং জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় কিভাবে হবে, তা স্পষ্ট করা হবে।
এই আলোচনার ফলাফল গাজা শান্তি পরিকল্পনার কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতিক্রিয়া ও সমর্থনই শেষ পর্যন্ত সংস্থার সাফল্য নির্ধারণ করবে।



