জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) সম্প্রতি হেলিক্স নেবুলার একটি নতুন ছবি প্রকাশ করেছে, যা এখন পর্যন্ত এই গ্রহীয় নেবুলার সবচেয়ে কাছের ও বিশদ দৃশ্য প্রদান করে। ছবিটি নিকট-ইনফ্রারেড ক্যামেরা (NIRCam) ব্যবহার করে তোলা, এবং বিজ্ঞানী ও সাধারণ পাঠক উভয়েরই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
হেলিক্স নেবুলা প্রথমে ১৯শ শতাব্দীর শুরুর দিকে আবিষ্কৃত হয় এবং এটি জলদস্যু রাশিচক্রের একাংশ, একুয়ারিয়াসে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫৫ আলোকবর্ষ দূরে এই নেবুলা আমাদের নিকটবর্তী গ্রহীয় নেবুলার মধ্যে অন্যতম, ফলে এটি প্রায়ই “ঈশ্বরের চোখ” বা “সৌরন চোখ” নামে পরিচিত।
২০০৪ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে তোলা ছবিতে নেবুলার গোলাকার গঠন ও কেন্দ্রীয় গহ্বর স্পষ্ট দেখা যায়, তবে সেই ছবিতে সূক্ষ্ম গঠনগুলো সীমিত রেজোলিউশনের কারণে অস্পষ্ট রয়ে গিয়েছিল। হাবল ছবিতে দেখা যায় নেবুলার মোটামুটি রূপ, তবে তার ভিতরের ছোটখাটো কাঠামো স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি।
নতুন JWST ছবিতে নিকট-ইনফ্রারেড আলোর সুবিধা নিয়ে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি বিশদ দেখা যায়। NIRCam ক্যামেরা নেবুলার গ্যাস ও ধূলিকণার তাপীয় বিকিরণকে উজ্জ্বল করে, ফলে গোপনীয় গঠনগুলো পরিষ্কারভাবে প্রকাশ পায়। এই প্রযুক্তি নেবুলার গঠনকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেয়।
ছবিতে বিশেষভাবে দেখা যায় লালচে রঙের পিলার-সদৃশ গঠন, যেগুলোকে কমেটারি নট (cometary knot) বলা হয়। এই নটগুলো ছোট, ঘূর্ণায়মান গ্যাসের গুঁড়ি, যা নেবুলার কেন্দ্রে থাকা মৃত তারার তীব্র বাতাসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে গঠিত হয়। পূর্বের ছবিতে এই নটগুলো কেবল দাগের মতো দেখা যেত, এখন সেগুলো স্পষ্টভাবে আলাদা।
বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন যে মৃত তারার তীব্র গরম গ্যাসের প্রবাহ ধীর গতি সম্পন্ন ধূলিকণার শেলকে আঘাত করে, ফলে গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ে এবং রঙিন পিলার গঠন হয়। এই প্রক্রিয়া নেবুলার গ্যাসকে ঠাণ্ডা করে, যা ভবিষ্যতে নতুন তারকা ও গ্রহের গঠনকে উৎসাহিত করতে পারে।
গ্রহীয় নেবুলা হল এমন একটি পর্যায় যেখানে মৃত তারার বাইরের স্তর ছড়িয়ে যায় এবং নতুন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। হেলিক্স নেবুলা এই রূপান্তরের একটি ক্লাসিক উদাহরণ, এবং JWST এর নতুন ছবি এই প্রক্রিয়ার সূক্ষ্মতা উন্মোচন করে।
এই ছবির প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়, কারণ নিকট-ইনফ্রারেড পর্যবেক্ষণ নেবুলার গ্যাসের রসায়ন ও গতিবিদ্যা সম্পর্কে নতুন তথ্য সরবরাহ করে। গবেষকরা আশা করেন যে এই ডেটা ব্যবহার করে তারা নেবুলার গঠনগত বিবর্তনকে আরও নির্ভুলভাবে মডেল করতে পারবে।
JWST এর উন্নত সেন্সর ও বৃহৎ আয়না নেবুলার মতো দূরবর্তী বস্তুকে উচ্চ রেজোলিউশনে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। নিকট-ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তুলনায় ধূলিকণার মাধ্যমে কম বাধা পায়, ফলে গ্যাসের গোপনীয় অংশগুলো স্পষ্ট হয়। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নেবুলার গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
হাবল ছবির তুলনায় JWST ছবির রেজোলিউশন প্রায় তিন গুণ বেশি, যা নেবুলার ভিতরের ছোটখাটো গঠনকে বিশদভাবে দেখার সুযোগ দেয়। ফলে বিজ্ঞানীরা এখন নেবুলার গ্যাসের ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও গতি সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে সক্ষম।
গ্রহীয় নেবুলা তারকা জীবনের শেষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন, এবং হেলিক্স নেবুলা তার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। এই নতুন ছবি আমাদেরকে দেখায় কিভাবে মৃত তারার শেষ নিঃশ্বাস নতুন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সৃষ্টির ভিত্তি গড়ে তোলে।
পাঠকরা এই চমকপ্রদ দৃশ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে মহাকাশের রহস্য অন্বেষণ চালিয়ে যেতে পারেন। ভবিষ্যতে JWST কী ধরনের নতুন আবিষ্কার করবে, তা নিয়ে আপনার কী ধারণা? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



