মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশে ইরান ও ইসরায়েল দু’টি দেশ তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরিসীমা ও নির্ভুলতা বাড়াতে প্রতিযোগিতা করছে। ২০২৬ সালে দুই দেশের অস্ত্রাগার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার দূরত্বে পারস্পরিক হুমকি মূলত দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে গঠন করছে। এই পরিস্থিতি উভয় পক্ষকে কৌশলগতভাবে দূরপাল্লার আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বাধ্য করেছে।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে শাহাব-৩, যা তরল জ্বালানি ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম। এই পরিসীমা তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ অংশকে নিজের নাগালের মধ্যে রাখার সুযোগ দেয়। শাহাব-৩ এর উন্নত গাইডেন্স সিস্টেমের ফলে লক্ষ্যভ্রষ্টতার সীমা কমে, যদিও সুনির্দিষ্ট নির্ভুলতা সম্পর্কে সরকারি তথ্য সীমিত।
ইরানের সাম্প্রতিক উন্নয়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ইমাদ ক্ষেপণাস্ত্র, যার বিশেষত্ব হল ম্যানুভারেবল রিএন্ট্রি ভেহিকল (MRV) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর ক্ষেপণাস্ত্রের পথ পরিবর্তন করতে সক্ষম, ফলে শত্রু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা আটকানো কঠিন হয়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ইমাদ ৫০ মিটার ব্যবধানে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, যা অঞ্চলের অন্যান্য ব্যালিস্টিক সিস্টেমের তুলনায় উচ্চ নির্ভুলতা নির্দেশ করে।
ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক অস্ত্র হল সেজ্জিল, যা কঠিন জ্বালানি (সলিড ফুয়েল) ব্যবহার করে দ্রুত প্রস্তুত করা যায়। সেজ্জিলের গতি শব্দের চেয়ে বহু গুণ বেশি, ফলে এটি এয়ার ডিফেন্সের জন্য সনাক্ত করা ও বাধা দেওয়া কঠিন। এই বৈশিষ্ট্য ইরানকে দ্রুত আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা প্রদান করে, বিশেষত সংকটপূর্ণ সময়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে।
ইসরায়েল তার ব্যালিস্টিক ক্ষমতা গড়ে তুলতে জেরিকো সিরিজের ওপর নির্ভরশীল। জেরিকো-২ প্রায় ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে কাজ করতে পারে, যা ইরানের শাহাব-৩ এর সমতুল্য পরিসীমা প্রদান করে। জেরিকো-৩ আরও উন্নত সংস্করণ, যা ৬,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি রেঞ্জের দাবি করে, ফলে ইসরায়েলকে আন্তঃমহাদেশীয় স্তরে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা দেয়।
ইসরায়েলের ব্যালিস্টিক প্রযুক্তির অন্যতম শক্তি হল তার নির্ভুলতা। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, জেরিকো সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র ২০ মিটারের নিচে লক্ষ্যভ্রষ্টতা বজায় রাখতে পারে, যা ইরানের বর্তমান সিস্টেমের ৩০ মিটারের চেয়ে বেশি সুনির্দিষ্ট। এই নির্ভুলতা ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে কম সংখ্যক রাউন্ডে উচ্চ প্রভাবশালী লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের সুযোগ দেয়।
ইসরায়েল তার এয়ার ডিফেন্সও আধুনিকায়ন করেছে। ইরানের ফাত্তাহ-১ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির মুখে, ইসরায়েল এয়ারো-৩ ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থা আপডেট করেছে, যা উচ্চ গতির ব্যালিস্টিককে ধ্বংস করতে সক্ষম। এই ব্যবস্থা ব্যালিস্টিকের উচ্চ উচ্চতা ও দ্রুত গতি সনাক্ত করে, এবং পুনঃপ্রবেশের সময়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে, ফলে ইরানের হাইপারসনিক হুমকির প্রতিক্রিয়া বাড়ে।
দুই দেশের প্রযুক্তিগত পার্থক্য সত্ত্বেও, উভয়েরই লক্ষ্য একই: দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার। ইরান তার MRV প্রযুক্তি ও সলিড ফুয়েল মিসাইলের গতি বাড়িয়ে প্রতিরক্ষা বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করছে, আর ইসরায়েল নির্ভুলতা ও আধুনিক এয়ার ডিফেন্সে জোর দিয়ে শত্রুর হাইপারসনিক হুমকির মোকাবিলা করছে।
এই প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি ইরান তার MRV প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করে, তবে ইসরায়েলের বর্তমান এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের নির্ভুলতা ও দীর্ঘপরিসীমা জেরিকো-৩ এর সফল ডিপ্লয়মেন্ট ইরানের কৌশলগত পরিকল্পনাকে সীমিত করতে পারে। উভয় পক্ষের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ অঞ্চলীয় নিরাপত্তা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অবশেষে, ইরান ও ইসরায়েলের ব্যালিস্টিক ক্ষমতার উন্নয়ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর কাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনসহ প্রধান শক্তিগুলো এই দুই দেশের সামরিক অগ্রগতির ওপর নজর রাখছে, এবং সম্ভাব্য অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় এই বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। তাই, পরবর্তী মাসে দু’দেশের মধ্যে কোনো নতুন পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ বা কূটনৈতিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উচ্চ, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলবে।



