শীতের শেষের দিকে পুরনো ঢাকার গলিতে রঙিন ঘুড়ি উড়ে, সাকরাইন উৎসবের গুঞ্জন শোনা যায়। এই উত্সবটি শহরের ঐতিহ্যবাহী ঋতুপ্রধান অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে একত্রিত করে। ঘুড়ি প্রতিযোগিতা, রঙের ছোঁয়া এবং পারস্পরিক বন্ধনই এর মূল আকর্ষণ, যা শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দৃঢ় করে।
সাকরাইন সময় আকাশে উড়ে বেড়ানো ঘুড়িগুলো শীতের নীল মেঘের পটভূমিতে এক রঙিন চিত্র তৈরি করে। স্থানীয় বাসিন্দা ও তরুণরা বিভিন্ন আকার ও নকশার ঘুড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, আর গলির কোণায় বসে থাকা বয়স্করা উচ্ছ্বাসে তালি দেয়। এই অনুষ্ঠানটি শুধু বিনোদন নয়, বরং স্থানীয় রীতি-নীতি ও হিন্দু-ইসলামিক সমন্বয়ের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ঘুড়ি উড়ানোর ঐতিহ্য ঢাকায় মুঘল শাসনকালে শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। মুঘল কর্মকর্তারা এবং ঢাকার নবাবরা ঋতু পরিবর্তনের সময় ঘুড়ি প্রতিযোগিতা আয়োজন করে, যা শস্য কাটার শেষের চিহ্ন হিসেবে দেখা হতো। ঐতিহাসিক রেকর্ডে উল্লেখ আছে যে, মুঘল শাসনকালে শস্যের ফসল সংগ্রহের পর ঘুড়ি উড়ানো একটি সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে গৃহীত হয়।
মুঘল ও নবাবদের এই উদ্যোগ ঘুড়ি উড়ানোর প্রথাকে শহরের সংস্কৃতিতে স্থায়ী করে তুলেছিল। হাকিম হাবিবুর রহমানের রচনায় উল্লেখ আছে যে, ঘুড়ি উড়ানো মূলত ফসলের শেষের সময়ের আনন্দের প্রকাশ ছিল এবং এটি সামাজিক সমাবেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এই সময়ে তরুণ ও পুরুষরা ঘুড়ি দিয়ে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত, যা পারস্পরিক স্নেহ ও বন্ধুত্বের সূচক ছিল।
মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে সাকরাইনের কিছু বিশেষ দিক জানা যায়। ১৭৫৭ সালের পর মির জাফরের পুত্র মিরন, যিনি ঢাকায় প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন, ঘুড়ি উড়ানোর প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণের জন্য পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় কাহিনিতে বলা হয়, মিরন পাউশ মাসের শেষ দিনে ঘুড়ি উড়ানোর প্রথা চালু করেন, যা আজও পুরনো ঢাকায় পালন করা হয়।
মুঘল শাসনের আরেকটি দিক হল আর্থিক বা কর সংগ্রহের চক্রের শেষের সঙ্গে ঘুড়ি উড়ানোর অনুষ্ঠানকে যুক্ত করা। ঐতিহাসিক সূত্রে দেখা যায়, কর সংগ্রহের শেষ দিনগুলোতে তরুণরা ঘুড়ি দিয়ে আনন্দের প্রকাশ করত, যা শাসনকালের আর্থিক দায়িত্বের সমাপ্তি নির্দেশ করে। এই রীতি শাসন ও কৃষি কাজের সমাপ্তির পর একটি মুক্তি ও উদযাপন হিসেবে কাজ করত।
সাকরাইন শুধুমাত্র একটি খেলাধুলা নয়, এটি সামাজিক রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘুড়ি উড়ানোর সময় গলির মানুষ একত্রিত হয়ে গল্প শেয়ার করে, খাবার ভাগ করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে মজবুত করে। এই ধরনের সমাবেশ শহরের ঐতিহ্যবাহী গোষ্ঠীকে সংহত করে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
আজকের দিনে সাকরাইন উৎসবের গুরুত্ব আরও বাড়ছে, কারণ আধুনিক নগরায়নের চাপের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী রীতি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও পুরনো ঢাকার গলি ও বাগানে ঘুড়ি উড়ানোর দৃশ্য এখনও দেখা যায়, যা শহরের সাংস্কৃতিক ধারাকে জীবন্ত রাখে। স্থানীয় প্রশাসনও এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণে সহায়তা করে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই রঙিন উড়ান উপভোগ করতে পারে।
সাকরাইন উত্সবের মূল উদ্দেশ্য হল ঋতু পরিবর্তনের আনন্দ ভাগাভাগি করা এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করা। ঘুড়ি উড়ানোর মাধ্যমে মানুষ একে অপরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, যা শহরের ঐতিহাসিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করে। এই ঐতিহ্যিক অনুষ্ঠানটি ঢাকার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের একটি চিত্র, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত হলেও তার মূল সত্তা অটুট রয়ে গেছে।
পাঠকের জন্য বিশেষ টেকঅ্যাওয়ে: সাকরাইন শুধু শীতের একটি রঙিন দৃশ্য নয়, এটি পুরনো ঢাকার সামাজিক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক শিকড় এবং সমন্বিত সংস্কৃতির প্রতীক। এই উত্সবের মাধ্যমে শহরের ইতিহাস ও বর্তমানের সংযোগ স্থাপন করা যায়, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঐতিহ্যের মূল্যকে পুনরায় উপলব্ধি করা সম্ভব।



