ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এমমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ২০২৪ সালের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ইউরোপের স্বার্থ রক্ষার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপ “শক্তিমানের আইন” মেনে চলবে না এবং অন্যথায় মহাদেশটি পরাধীনতার পথে ধাবিত হতে পারে।
ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা ফোরামে সংযত সুরে কথা বলার চেষ্টা করলেও, ম্যাক্রোঁ সরাসরি তীব্র ভাষায় তার অবস্থান তুলে ধরেন। তার বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক হুমকির প্রতিক্রিয়া জানানো।
ম্যাক্রোঁ বলেন, “শক্তিমানের আইন চুপচাপ মেনে নেবে না” এবং জোর দিয়ে বলেন যে ইউরোপের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি যুক্তি দেন, বিশ্বে নীতিহীনতা বাড়লেও ইউরোপের স্বতন্ত্রতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অটল থাকা উচিত।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের আরও একটি মন্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে বললেন, “গুণ্ডামির বদলে সম্মান, বর্বরতার বদলে আইনের শাসনই আমাদের পছন্দ”। এই শব্দগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে তার দৃঢ় অবস্থানকে তুলে ধরে।
বক্তৃতার সময় ম্যাক্রোঁয়ের চোখে এভিয়েটর সানগ্লাস দেখা যায়। সূত্র অনুযায়ী, তিনি সাম্প্রতিক সময়ে রক্তনালী ফেটে যাওয়ার কারণে চোখের সুরক্ষার জন্য এই চশমা ব্যবহার করছেন। এই ছোটো বিবরণটি তার স্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ট্রাম্পের ফরাসি ওয়াইন ও শ্যাম্পেইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকির পর, ম্যাক্রোঁ দাভোসেতে এই বিষয়টি উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপের বিরুদ্ধে রক্ষা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফরাসি পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্য অবস্থানে রাখতে হবে।
ট্রাম্পের দাভোসে উপস্থিতি এবং তার ব্যক্তিগত বার্তা ফাঁস হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ম্যাক্রোঁ সেই বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং রাশিয়া ও অন্যান্য দেশকে নিয়ে একটি জি‑৭ বৈঠকের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।
ম্যাক্রোঁ একই সময়ে ট্রাম্পকে প্যারিসে একটি সরকারি সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। তবে ট্রাম্পের এই আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, যা দু’দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়।
ম্যাক্রোঁ বুধবার দাভোসে থেকে প্রস্থান করবেন, আর ট্রাম্পের একই দিনে ফোরামে বক্তব্য রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সময়সূচি দু’নেতার সরাসরি সাক্ষাৎকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ঘটনাবলি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। শুল্কের হুমকি এবং আইনের শাসনের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক আলোচনার জটিলতা বাড়াতে পারে।
দাভোসে ফোরামের পরবর্তী সপ্তাহে গি‑৭ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের নীতি ও টার্গেটের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা গুরুত্বপূর্ণ হবে। ম্যাক্রোঁয়ের দৃঢ় রেটোরিক এবং ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদক্ষেপের পারস্পরিক প্রভাব আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, দাভোসে ম্যাক্রোঁ ইউরোপের স্বায়ত্তশাসন ও আইনের শাসন রক্ষার জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছেন, একই সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্যিক হুমকি ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। দুই দেশের নেতৃত্বের এই পারস্পরিক টানাপোড়েন ভবিষ্যতে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



