রাজবাড়ি জেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী চরে রাসেলস ভাইপারসহ অন্যান্য বিষধর সাপের কামড়ে সম্প্রতি বেশ কয়েকজন কৃষক আহত হয়েছেন। বিশেষত ধান কাটার মৌসুমে সাপের কামড়ে আহতের সংখ্যা বেড়ে যায়, ফলে চরের আশেপাশের গ্রামগুলোতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সাপের আক্রমণ কমলেও বর্ষাকালে সাপের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়, যা কৃষকদের কাজের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে রাজবাড়ি জেলায় মোট ৩৭০ জন সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন, যার মধ্যে রাসেলস ভাইপার অন্যতম। সিভিল সার্জন এস.এম. মাসুদের নির্দেশে, সাপের কামড়ে আহত রোগীকে সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে অযথা ওঝা (প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র) পার হওয়া এড়ানো যায়।
পাংশা উপজেলার শাহমীরপুর গ্রামে ধান কাটার কাজের মাঝখানে কৃষক মো. হেলাল বিশ্বাসের পায়ে রাসেলস ভাইপার কামড়ায়। সাপটি ধরার পর তিনি তা পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। এই ঘটনার পর থেকে গ্রামের মানুষদের মধ্যে সাপের ভয় ছড়িয়ে পড়েছে, এবং তারা কৃষি কাজ করতে দ্বিধাগ্রস্ত।
শাহমীরপুরের পদ্মা চরাঞ্চলে বর্তমানে আখের গাছের মাড়াই কাজ চলছে। তবে সাপের উপস্থিতি নিয়ে কৃষকরা কাজের আগে বাঁশ বা লাঠি ব্যবহার করে মাটি নেড়ে সাপের সম্ভাব্য গোপনস্থান পরীক্ষা করছেন। এই সতর্কতা সত্ত্বেও, তারা প্রতিদিন সাপের ভয় নিয়ে মাঠে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
হেলাল বিশ্বাসের স্ত্রী বিথি খাতুন জানান, তিন মাস আগে স্বামী সাপের কামড়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং এখনো চিকিৎসা চলমান। চিকিৎসা খরচের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য, যেখানে একাধিক পরীক্ষা ও রক্তের বিশ্লেষণে হাজার টাকা খরচ হয়। সরকারি হাসপাতালের সুবিধা সীমিত, ফলে বেসরকারি ক্লিনিকের উচ্চমূল্য তাদের আর্থিক অবস্থাকে কঠিন করে তুলেছে। তিনি বলেন, “চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য টাকা সংগ্রহে সমস্যার মুখে পড়েছি, আর পরীক্ষার খরচ বাড়তে থাকায় আমাদের পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়ছে।”
অন্য এক কৃষক, যিনি নাম উল্লেখ না করে চরের কাজের কথা বলছেন, জানান যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “এখানে সাপের আক্রমণ বাড়ছে, অনেকের কামড়ে আহত হয়েছে, কেউ কেউ সাপকে হত্যা করেছে, তবে সাপের সংখ্যা কমে না।” এই পরিস্থিতি চরের কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা হুমকির মুখে ফেলছে।
সাপের কামড়ে আহত রোগীর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে, স্বাস্থ্য বিভাগ স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীদের সাপের বিষের অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি, কৃষকদের জন্য সাপের আচরণ ও প্রথম সাহায্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। তবে এখনো গ্রামগুলোতে সাপের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বিদ্যমান, এবং কৃষকরা নিরাপদে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছেন।
এই ধরনের সাপের আক্রমণ কমাতে, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করে সাপের বাসস্থান নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকরা আশা করছেন যে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে, ভবিষ্যতে সাপের কামড়ে আহত হওয়ার সংখ্যা কমে যাবে এবং চরের কৃষি কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।



