রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে, শ্রম মাইগ্রেশন ক্ষেত্রের সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে স্পষ্ট ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতির আহ্বান শোনা যাচ্ছে। মাইগ্রেশন দেশের অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখলেও, তা এখনও অপর্যাপ্ত শাসন ও আর্থিক সহায়তার মুখে। তাই, নির্বাচনের আগে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, শাসন শক্তিকরণ এবং কর্মী সুরক্ষার বিষয়গুলোকে ম্যানিফেস্টোর মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা ম্যানিফেস্টোতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য বেশ কিছু মূল পদক্ষেপের তালিকা উপস্থাপন করেছেন। প্রথমত, মাইগ্র্যান্ট কর্মীদের কল্যাণে বাজেটের অংশ বাড়িয়ে কমপক্ষে জাতীয় বাজেটের এক শতাংশ নিশ্চিত করা উচিত। দ্বিতীয়ত, দশ বছরের একটি সমন্বিত জাতীয় মাইগ্রেশন ভিশন গড়ে তোলা, যাতে সমস্যাগুলো ধারাবাহিকভাবে সমাধান করা যায়। তৃতীয়ত, পুরনো শ্রম বাজার পুনরায় চালু করা এবং নতুন বিদেশি গন্তব্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
দক্ষতা উন্নয়নের দিক থেকে, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই প্রশিক্ষণগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে, মাইগ্র্যান্ট কর্মীদের দক্ষতা বাড়িয়ে তাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করা যাবে। পাশাপাশি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা কমিয়ে, সরাসরি ও স্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতি নিশ্চিত করা জরুরি।
ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের মাধ্যমে মাইগ্র্যান্টদের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ সহজ করা, এবং রেমিট্যান্স চ্যানেলকে আরও নিরাপদ ও দ্রুতগামী করা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা গুলো মাইগ্র্যান্ট কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা বাড়াবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে স্বচ্ছতা আনবে। এছাড়া, বিদেশে কাজ করা কর্মীদের জন্য সেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দেশে ফিরে আসার পর পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন।
প্রফেসর তাসনিম সিদ্দিকি, রিফিউজি ও মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (RMMRU) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (অ্যাক্টিং), উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে সরকার জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.০৮ শতাংশই মাইগ্রেশন সেক্টরে ব্যয় করে, যদিও এই সেক্টর থেকে বার্ষিক প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়। তিনি বাজেটের কমপক্ষে এক শতাংশ মাইগ্র্যান্ট কর্মীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে বরাদ্দের দাবি করেন এবং দশ বছরের একটি জাতীয় মাইগ্রেশন ভিশন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলেন, “দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি ছাড়া সমস্যাগুলো টুকরো টুকরো করে সমাধান করা সম্ভব নয়।”
সিদ্দিকি আরও প্রস্তাব করেন, মাইগ্রেশন বিষয়ক একটি স্বতন্ত্র দিকনির্দেশনা তৈরি করা হোক, যার মধ্যে কল্যাণ, ইমিগ্রেশন ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য তিনটি শাখা থাকবে। পাশাপাশি, বর্তমান ব্যুরো অফ ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেইনিং (BMET) কে পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনায় রূপান্তরিত করার আহ্বান জানান।
মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির গুণগত মাইগ্রেশন ও শাসনের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, নীতি নির্ধারকদের নিয়োগ ব্যবসায় জড়িত না থাকা উচিত, যাতে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো যায় এবং মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকে। তার মতে, শাসন কাঠামোর শক্তিকরণ এবং মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই মাইগ্রেশনকে টেকসই ও লাভজনক করে তুলবে।
এইসব দাবি ও প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে এখনই মাইগ্রেশন সংস্কারের জন্য স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করতে হবে। মাইগ্র্যান্ট কর্মীদের পরিবার ও সমর্থক গোষ্ঠী নির্বাচনী সময়ে বড় ভোটার গোষ্ঠী গঠন করে, তাই এই বিষয়টি উপেক্ষা করা রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাইগ্রেশন সেক্টরের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও শক্তিশালী করবে। তাই, ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাজেটের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা, সংস্থার কাঠামো পুনর্গঠন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
অবশেষে, বিশেষজ্ঞরা একমত যে, মাইগ্রেশন সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যথাযথ আর্থিক সহায়তা এবং স্বচ্ছ শাসন কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। এই দিকগুলোকে ম্যানিফেস্টোর মূল অংশে অন্তর্ভুক্ত করা হলে, দেশের মাইগ্রেশন থেকে অর্জিত আয়কে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং মাইগ্র্যান্ট কর্মীদের জীবনমান উন্নত হবে।
নির্বাচনের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে, মাইগ্রেশন সংস্কারের বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসবে এবং পার্টিগুলোর প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মনোভাব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



