গোগনগর ইউনিয়নের মসিনাবন্দ বাড়িরটেক এলাকায় অবস্থিত প্লাস্টিক সাইন প্রাইভেট লিমিটেড কারখানায় বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ২:৩০ টায় অগ্নিকাণ্ড ঘটার সূত্র পাওয়া যায়। আগুনের শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে আশেপাশের বাড়ি-বাড়ি অস্থায়ীভাবে ধোঁয়ার মধ্যে ঢাকা পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে ভেসে যাওয়া ধোঁয়া থেকে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।
ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং প্রায় ছয় টায় অগ্নি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিয়ন্ত্রণের কাজের মধ্যে হাইড্রান্ট ব্যবহার, ফোম লিকুইড ছিটানো এবং আগুনের মূল উৎস চিহ্নিত করে তা নিভিয়ে দেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন জানান, “চার ঘণ্টা পরই আমরা আগুন সম্পূর্ণভাবে নিভিয়ে ফেলেছি এবং কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।”
কারখানাটি মূলত পলিব্যাগ, হ্যাংগার এবং স্কচ টেপসহ বিভিন্ন ধরণের প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন করত। উৎপাদন লাইনে কাঁচামাল হিসেবে রেজিন, পলিথিন এবং অন্যান্য দাহ্য পদার্থ সংরক্ষিত থাকায় অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা বাড়ে। কর্মীদের মতে, আগুনের শিখা প্রথমে একটি ছোট যন্ত্রপাতি থেকে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে পুরো গুদাম জুড়ে বিস্তার লাভ করে।
আবদুল্লাহ আল আরেফিন উল্লেখ করেন, “কারখানার ভিতরে প্লাস্টিকের কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য সংরক্ষিত থাকায় অগ্নি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।” তিনি আরও বলেন, “শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তবে সঠিক কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্ত চলমান।”
স্থানীয় পুলিশ বিভাগ ঘটনাস্থলে তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রমাণ সংগ্রহে লিপ্ত। তদন্তের প্রথম ধাপ হিসেবে ইলেকট্রিক্যাল প্যানেল, সুরক্ষা সুইচ এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড পরীক্ষা করা হবে। কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তা মানদণ্ডের লঙ্ঘন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপনা দলকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত করা হয়েছে এবং তারা তদন্তের সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারা জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া, ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতির নিয়মিত পরিদর্শন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ফলে কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর আঘাতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে কিছু কর্মী ধোঁয়ার শ্বাসজনিত অস্বস্তি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা বিভাগের মতে, তাদের অবস্থা স্থিতিশীল এবং কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব।
স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটিকে “অবহেলামূলক অগ্নিকাণ্ড” হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতে নিরাপত্তা মানদণ্ডের কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। গৃহস্থালি ও শিল্পক্ষেত্রে অগ্নি প্রতিরোধক ব্যবস্থা না থাকলে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে, এ কথা কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন।
ফায়ার সার্ভিসের মতে, অগ্নিকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত ফায়ার ফাইটিং সরঞ্জাম যথাযথভাবে কাজ করেছে, তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের শিল্পে অগ্নি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। তারা স্থানীয় ব্যবসায়িক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করছে।
আইনি দিক থেকে, যদি তদন্তে পাওয়া যায় যে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল বা কারাবাসের মতো শাস্তি দেওয়া হতে পারে। স্থানীয় আদালত এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার পর, নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রেও নিরাপত্তা পরিদর্শন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রণের ফলে কোনো প্রাণহানি না ঘটায় ভাগ্যবান হলেও, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে শিল্পখাতে কঠোর নিয়মাবলী এবং নিয়মিত পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোরদার করা হবে।



