ইসরায়েল ২০২৫ সালে তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের বৃহৎ চুক্তি সম্পন্ন করেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর দেশের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, চীন এবং জার্মানি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই চুক্তিগুলো দেশীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ নিশ্চিত করেছে এবং ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শক্তি সেক্টরে মিশরের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অনুমোদিত এই চুক্তির অধীনে, ২০২৬ সাল থেকে ইসরায়েল লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্র থেকে মিশরের জন্য ১৩০ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করবে, যার মোট মূল্য সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার। এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য মিশরের জ্বালানি নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয় এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে গুগল (অ্যালফাবেট) ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের অধিগ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় ৩২০০ কোটি ডলার মূল্যের এই লেনদেনের সমাপ্তি ১০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত, যা গুগলের সাইবার নিরাপত্তা পোর্টফোলিওকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে। একই সময়ে, প্যালো অল্টো নেটওয়ার্কস ২৫০০ কোটি ডলারে সাইবারআর্কের অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে, যা ইসরায়েলকে সাইবার নিরাপত্তা হাব হিসেবে আরও দৃঢ় করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্ষেত্রে এনভিডিয়া ইসরায়েলে তার বৃহত্তম এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিনিয়োগ ইসরায়েলের এআই ইকোসিস্টেমকে গ্লোবাল স্তরে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে এবং স্থানীয় স্টার্টআপ ও গবেষণা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
প্রতিরক্ষা রপ্তানির ক্ষেত্রে জার্মানির সঙ্গে চুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বে ৩১০ কোটি ডলার মূল্যের চুক্তি ছিল, যা এখন সাড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে জার্মানি ইসরায়েলের উন্নত দূরপাল্লা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো‑৩’ সংগ্রহ করবে, যা ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে এবং ইসরায়েলের রপ্তানি আয়কে দ্বিগুণের কাছাকাছি বৃদ্ধি করবে।
ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম ও নজরদারি প্রযুক্তির আঞ্চলিক চাহিদা, বিশেষ করে ফিলিস্তিন এবং পার্শ্ববর্তী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়কে ত্বরান্বিত করেছে। এই প্রযুক্তিগুলো উচ্চ মানের পরীক্ষিত পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃত, যা রপ্তানি পরিমাণে ধারাবাহিক বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।
গুগল, এনভিডিয়া এবং প্যালো অল্টো নেটওয়ার্কসের মতো বিশ্ববিখ্যাত টেক জায়ান্টদের ইসরায়েলি বাজারে বিনিয়োগ ও অধিগ্রহণের ফলে দেশের প্রযুক্তি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এই প্রবণতা স্থানীয় উদ্ভাবনী সংস্থাগুলোর জন্য তহবিলের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসরায়েলের শীর্ষ অংশীদারদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, চীন এবং জার্মানির উপস্থিতি দেশের বহুমুখী রপ্তানি কাঠামোকে নির্দেশ করে। এই বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি হ্রাস করে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
ইসরায়েলি সরকার এই চুক্তিগুলোকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে, যাতে জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা একসাথে উন্নত হয়। সরকারী নীতি ও প্রণোদনা প্রোগ্রামগুলো বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে এবং স্থানীয় শিল্পকে সমর্থন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই চুক্তিগুলো ইসরায়েলের জিডিপি বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখবে এবং পরবর্তী কয়েক বছর ধরে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে সহায়তা করবে। বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি ও উচ্চ প্রযুক্তি সেক্টরের আয় বৃদ্ধি দেশের মোট রপ্তানি পরিমাণকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, ইসরায়েলকে প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে গ্লোবাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আরও বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে, জ্বালানি চুক্তি মিশরের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চেইন স্থাপন করবে, যা উভয় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করবে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে ইসরায়েল যে বৃহৎ চুক্তিগুলো সম্পন্ন করেছে, তা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে বহুমুখী করে তুলেছে, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করবে।



