গত মঙ্গলবার জাতীয় কমিটির চারজন সদস্যের তথ্যের ভিত্তিতে আদানির সঙ্গে জড়িত বিদ্যুৎ চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গেছে। এই চুক্তিগুলো পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে একতরফা স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে সাজানো বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
কমিটি এ তথ্যগুলো জাতীয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তির নির্দিষ্ট অনিয়ম তুলে ধরা একটি পৃথক প্রতিবেদনও জমা হয়েছে, যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ এখনো তা প্রকাশ করেনি।
মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, এই প্রতিবেদনগুলো বিদ্যুৎ বিভাগে পর্যালোচনা করা হবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের নির্দেশনা সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাবে। কমিটির সদস্যরা উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে একাধিক একতরফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে সব সুবিধা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে প্রদান করা হয় এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে। একই চুক্তিগুলো প্রায়ই একে অপরের নকল হিসেবে দেখা যায়।
চুক্তিগুলোতে গ্যাস সরবরাহ না থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষরের সুপারিশ করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বিদ্যুৎ সংস্থাগুলো এই চুক্তিগুলোর প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কমিটির একটি সূত্র জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পুরো প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে, সাবেক দুই বিদ্যুৎ সচিব, যাঁরা পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব হিসেবে কাজ করেছেন, আবুল কালাম আজাদ ও আহমদ কায়কাউস, তাদেরও এই দুর্নীতিমূলক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
জাতীয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে এই প্রতিবেদন ভিত্তিক তদন্তের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তদন্তের ফলাফল যদি চুক্তির অবৈধতা নিশ্চিত করে, তবে আদানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রকাশনা বিদ্যুৎ খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলতে পারে। আদানির মতো বড় আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে চুক্তিতে অনিয়ম প্রকাশিত হলে, ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্পের জন্য বিদেশি মূলধনের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া, বিদ্যুৎ মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহ নিরাপত্তা এবং গ্যাসের অভাবজনিত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় সরকারকে পুনরায় চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
যদি দুদক তদন্তে চুক্তির অবৈধতা প্রমাণ করে, তবে বিদ্যুৎ বিভাগকে সংশ্লিষ্ট চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করতে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ বিদ্যুৎ সেক্টরের আর্থিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে এবং বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর নগদ প্রবাহে চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য মূল্য বৃদ্ধি বা সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে, সরকার যদি এই চুক্তিগুলোকে পুনরায় মূল্যায়ন করে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে অনুরূপ অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন বিদ্যুৎ খাতে পূর্ববর্তী সরকারের চুক্তি প্রক্রিয়ার দুর্নীতিমূলক দিকগুলো উন্মোচন করেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে দুদক তদন্তের সম্ভাবনা, আইনি পদক্ষেপ এবং বাজারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে চুক্তির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ সেক্টরের স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা বজায় থাকে।



