অস্থায়ী সরকার গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে দুইটি নতুন বিভাগে ভাগ করার জন্য ব্যবসার নিয়ম অনুমোদন করে। এই দুইটি বিভাগ হল রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ, যা দেশের কর ব্যবস্থার সংস্কারের অংশ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। অনুমোদনটি জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিওর্গানাইজেশন (NICAR)-এর বৈঠকে নেওয়া হয়, যা চিফ অ্যাডভাইজার মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে তার সরকারি বাসভবন জামুনায় অনুষ্ঠিত হয়।
চিফ অ্যাডভাইজারের প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমের মতে, এই দুই বিভাগ ফেব্রুয়ারি মাসে স্বতন্ত্রভাবে কাজ শুরু করবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই বিভাজনের সিদ্ধান্ত বহু সময় আগে নেওয়া হয়েছিল এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে, তবে সরকারী নিয়ম অনুযায়ী NICAR-এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন ছিল, যা আজ সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন বিভাগগুলো আর্থিক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে থাকবে। ব্যবসার নিয়মগুলো সরকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম, দায়িত্ব, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। এই কাঠামোটি NBR-এর বিভাজনের পর প্রয়োগে আসবে, যা রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা দু’টি ক্ষেত্রকে আলাদা করে বিশেষায়িত করার লক্ষ্য রাখে।
রাজস্ব নীতি বিভাগে কর আইন প্রণয়ন, করের হার নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক কর চুক্তি তত্ত্বাবধান এবং কর ফাঁকি ও অব্যবহারের বিরুদ্ধে কৌশল তৈরি করার দায়িত্ব থাকবে। এছাড়া, এই বিভাগ রাজস্ব প্রবণতা পর্যবেক্ষণ এবং নতুন কর ফাঁকি পদ্ধতির উদ্ভব সনাক্তকরণের কাজও করবে।
অন্যদিকে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর সংগ্রহের বাস্তবিক দিক, করদাতার রেজিস্ট্রেশন, রিটার্ন সংগ্রহ, এবং কর পরিশোধের প্রক্রিয়া তদারকি করবে। এই বিভাগ কর ব্যবস্থার কার্যকরী ব্যবস্থাপনা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং করদাতার সেবা উন্নত করার জন্য দায়িত্বশীল হবে।
এই কাঠামোগত পরিবর্তনটি ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আদেশের ধারায় গৃহীত হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য কর প্রশাসনকে আধুনিকায়ন, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ বর্তমানে জিডিপির তুলনায় করের অনুপাত সর্বনিম্নের মধ্যে রয়েছে, যা অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে ধারাবাহিক সংস্কারের আহ্বান পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই দুই বিভাগে কাজের বিভাজন নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করবে, যা কর নীতির গঠন ও তার কার্যকরী বাস্তবায়ন উভয়ই উন্নত করবে। বিশেষ করে, কর ফাঁকি ও অব্যবহারের বিরুদ্ধে কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণে নীতি বিভাগকে অধিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হলে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সংগ্রহ প্রক্রিয়া চালাতে পারবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সংস্কার দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে আসছে। সরকারী ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এই ধাপকে ইতিবাচক বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে, কিছু সমালোচক উল্লেখ করেন যে, নতুন বিভাগগুলোর কার্যকরী সমন্বয় এবং মানবসম্পদ গঠন এখনও চ্যালেঞ্জ হতে পারে, যা বাস্তবায়নের সময় ধীরগতি ঘটাতে পারে।
ভবিষ্যতে, এই দুই বিভাগের স্বাধীনভাবে কাজ শুরু হওয়ার পর, সরকারী নীতি নির্ধারণে আরও স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। আর্থিক মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনকে দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।
সারসংক্ষেপে, অস্থায়ী সরকারের উদ্যোগে NBR-এর বিভাজন এবং ব্যবসার নিয়মের অনুমোদন দেশের কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার চাহিদা পূরণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই কাঠামোগত পরিবর্তন আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং দেশের আর্থিক নীতি ও ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



