লন্ডনের মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত সপ্তাহে ৮০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উপলক্ষে একটি ভাষণ দেন, যেখানে তিনি বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা এখন ‘মৃত্যুশয্যায়’ পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রশ্ন যে, যুদ্ধ‑পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটুকু অবশিষ্ট।
মেথডিস্ট সেন্ট্রাল হল ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত স্থান, তাই গুতেরেসের এই বক্তব্য ঐতিহাসিক স্মরণে ভরপুর। তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে তোলা শান্তি ও নিরাপত্তার কাঠামো আজ রাজনৈতিক স্বার্থপরতা, দূরদর্শিতার অভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের ফলে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
গুতেরেসের মতে, বহু দেশ এখন একতরফা নীতি ও শক্তি ভিত্তিক কৌশলে ঝুঁকে আছে, যা বহু-পাক্ষিক আলোচনার পরিবর্তে একতরফা সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রভাব কমে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক ঐক্য ভেঙে পড়ছে।
এই প্রবণতার পরিসংখ্যানিক প্রমাণও স্পষ্ট। গত অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় ২.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্বের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই ব্যয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করে, তবে একই সঙ্গে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ঘাটতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বৈশ্বিক দারিদ্র্য ও মানবিক সংকটের সঙ্গে সামরিক ব্যয়ের অপ্রতুলতা একটি তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে। উন্নয়নশীল দেশে মৌলিক সেবা প্রদান করতে ব্যর্থতা, আর ধনী দেশগুলো অস্ত্রশস্ত্রের ভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
পরিবেশগত সংকটও গুতেরেসের উদ্বেগকে তীব্র করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপমাত্রা রেকর্ড ধারাবাহিকভাবে ভাঙছে, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়ছে। একই সময়ে, জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের মুনাফা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদী স্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশ রক্ষার ওপর অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বৈশ্বিক সহযোগিতার অবনতি নিয়ে গুতেরেসের মতামতের বিপরীতে কিছু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এখনও সহযোগিতার গুরুত্ব জোর দিয়ে বলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কিছু এশীয় দেশ সাম্প্রতিক জলবায়ু সম্মেলন ও মহামারী মোকাবেলায় যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে একসাথে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তি দেন, যদিও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, তবু বহুপাক্ষিক কাঠামো মানবজাতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় অপরিহার্য।
গুতেরেসের এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সংস্কার ও পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করতে পারে। আসন্ন জাতিসংঘ শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সহযোগিতার নতুন মডেল প্রস্তাব করতে বলা হতে পারে, যাতে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও পরিবেশের সংযোগ স্থাপিত হয়।
সারসংক্ষেপে, গুতেরেসের ‘বৈশ্বিক সহযোগিতা মৃত্যুশয্যায়’ মন্তব্য আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার বর্তমান দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করে। বহুপাক্ষিকতা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও নৈতিক দায়িত্বের প্রয়োজন, নইলে বর্তমান প্রবণতা বিশ্বকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে।



