বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রাক্তন বাণিজ্য মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মঙ্গলবার ঢাকার বনানীর একটি হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের আয়োজিত সেমিনারে অর্থনীতির অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করে ডি-রেগুলেশন ও উদারীকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত, তাই আমাদের ডি-রেগুলেশন ও উদারীকরণের পথে হাঁটতে হবে। এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।” সেমিনারটি ‘পোস্ট ইলেকশন ২০২৬ হরাইজন; ইকোনোমি, পলিটিক্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীর্ষক আলোচনার অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশগ্রহণ করেন।
বক্তৃতার মাঝামাঝি খসরু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠু সম্পন্নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ভোটের পূর্ব প্রস্ততি চলছে। আমরা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হল নির্বাচনি প্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।” এছাড়া তিনি ১৬, ১৭ বা ১৮ বছর পর নাগরিকদের ভোটের মাধ্যমে এমন সরকার গঠনের সম্ভাবনা উল্লেখ করেন, যাকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
বিএনপি নেতার মতে, দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশি ফান্ড ম্যানেজারদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে তারা বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশকে কঠোর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে,” এবং যুক্তি দেন যে বর্তমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো বাজারের স্বায়ত্তশাসনকে বাধাগ্রস্ত করছে।
খসরু আরও উল্লেখ করেন যে নীতিগত বিকৃতি দেশের অন্যতম বড় সমস্যা। তিনি বলেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি আইন ও বিধিনিষেধ যুক্ত হয়েছে, অনেকগুলোই মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপনি হয় বাজারব্যবস্থা রাখবেন, নয়তো রাখবেন না—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়।” বাজারের ওপর আস্থা রাখতে হলে নিয়মগুলোকে সরল করে বাজারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, এটাই তার মূল দাবি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি সতর্ক করেন যে, গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে আটকে আছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ এবং বাজারমুখী নীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। “হোক সেটা বিনিময় হার, পুঁজিবাজার কিংবা আমদানি–রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই বাজারকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে,” তিনি জোর দিয়ে বলেন।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরাও বাজারের স্বায়ত্তশাসন ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের পক্ষে মত প্রকাশ করেন, যদিও তাদের মন্তব্যের বিশদ এখানে উল্লেখ করা হয়নি। সেমিনারটি শেষ হওয়ার পর সরকারী পক্ষ থেকে এই দাবিগুলোর উপর কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, যা বিষয়টির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
বিএনপি নেতার এই বক্তব্য দেশের অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার পাশাপাশি আসন্ন ২০২৬ নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ডি-রেগুলেশন ও উদারীকরণের দাবি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা পুঁজিবাজারের প্রবেশদ্বার খুলে বিদেশি মূলধনের আগমন ত্বরান্বিত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তবে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা ও জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নও উত্থাপিত হবে।
এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তাবনা প্রত্যাশা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, যে ডি-রেগুলেশন বিষয়টি পার্টি-ভিত্তিক বিতর্কে রূপ নিতে পারে এবং সরকারী নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে, তা দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল হবে।



