মার্চের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে ৩৬ জন বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়। এদের মধ্যে নোয়াখালীর থেকে ২১ জন, লক্ষ্মীপুর থেকে ২ জন এবং বাকি ১৩ জন বিভিন্ন জেলা—মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোণা—থেকে ছিলেন। ফ্লাইটটি মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় অবতরণ করে, বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) এর সমন্বয়ে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় তাদেরকে জরুরি সেবা ও পরিবহন প্রদান করা হয়।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, এই ৩৬ জনের অধিকাংশই প্রথমে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অনুমোদিত পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। তবে ব্রাজিল থেকে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার শেষে তাদের আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান হয় এবং মার্কিন প্রশাসন তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোট ২৯৩ জন বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশের পর ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত আসা এই ৩৬ জনের মধ্যে নোয়াখালীরের জাহিদুল ইসলাম সর্বোচ্চ খরচের শিকার, যিনি দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছানোর আশায় দালালদের হাতে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা প্রদান করেন। গাজীপুরের সুলতানা আক্তার ৩০ লক্ষ টাকা, নোয়াখালীরের মীর হাসান ৫৫ লক্ষ, রিয়াদুল ইসলাম ৫০ লক্ষ এবং রাকিব ৬০ লক্ষ টাকা দালালদেরকে দেন, তবে সবই ব্যর্থ হয়।
এই ঘটনার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতি উল্লেখযোগ্য। প্রেসিডেন্ট বায়ডেনের প্রশাসন অবৈধ প্রবেশের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকা থেকে আসা অভিবাসীদের জন্য দ্রুত ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া চালু করেছে। বিশেষ করে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রমের পর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো ব্যক্তিদের জন্য শরণার্থী আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায়, অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. রাহুল চক্রবর্তী উল্লেখ করেন, “যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি বৈধ কর্মী প্রবাহকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি অবৈধ পথের ব্যবহারকে কঠোরভাবে দমন করার দিকে মনোযোগী। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করা জরুরি, নতুবা উচ্চ আর্থিক ক্ষতি ও শরণার্থী প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বাড়ে।” তিনি আরও বলেন, “ব্রাজিলের মতো দেশে বৈধ কাজের অনুমতি পেয়ে, সেখান থেকে অবৈধভাবে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, যা শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরে আসার সম্ভাবনা বাড়ায়।”
ব্র্যাকের সহায়তা দল অবতরণ পরেই শরণার্থী ও ডিপোর্টেডদের জন্য মৌলিক সেবা প্রদান করে, যার মধ্যে রয়েছে খাবার, তামাক, এবং প্রাথমিক চিকিৎসা। এছাড়া, তারা পুনর্বাসন পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত পরামর্শও দেয়, যাতে এই ব্যক্তিরা দেশে ফিরে নতুন জীবনের সূচনা করতে পারে।
এই ডিপোর্টেশন ঘটনাটি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল দিকও উন্মোচন করে। দু’দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে বৈধ কর্মসংস্থান চ্যানেলকে শক্তিশালী করা যায় এবং অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি কমানো যায়। বাংলাদেশ সরকারের অভিবাসন মন্ত্রণালয়ও শ্রমিকদের জন্য বৈধ রুটের তথ্য প্রচার বাড়াতে এবং দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশের পর ৩৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে শূন্য হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেখানে প্রত্যেকেরই স্বপ্ন পূরণের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক বিনিয়োগ ছিল। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতির কঠোরতা, বৈধ কর্মসংস্থান চ্যানেলের প্রয়োজনীয়তা এবং কূটনৈতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে, উভয় দেশই বৈধ রুটের উন্নয়ন ও দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে মনোযোগ দিতে হবে।



