ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একটি প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচিত লাল টুপি নতুন রূপে দেখা যায়। টুপি, যার ওপর “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” স্লোগান ছিল, এখন “মেক আমেরিকা গো অ্যাওয়ে” লেখা রূপে প্রতিবাদকারীদের হাতে উঠে এসেছে। এই পরিবর্তনটি গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী আন্দোলনের নতুন চিত্র তুলে ধরছে।
ট্রাম্পের লাল টুপি প্রথমবার ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় প্রচারমূলক সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেই সময়ে স্লোগানটি আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরিচয়কে দৃঢ় করে তুলেছিল। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হওয়ার পরও, ট্রাম্প ২০২৪ সালের পুনর্চয়নের প্রস্তুতি নিতে টুপি পুনরায় ব্যবহার করে হোয়াইট হাউসে পুনরায় প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন।
তবে এখন এই একই টুপি ইউরোপের উত্তরে নতুন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড, যা ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, এবং ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে প্রতিবাদকারীরা টুপিটিকে ব্যঙ্গের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক দাবিকে চ্যালেঞ্জ করছে। টুপি ওপরের পরিবর্তিত স্লোগানটি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক নীতির প্রতি বিরোধিতা এবং গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদে লাল টুপি পরিধানকারী অংশগ্রহণকারীরা টুপির ওপর নতুন স্লোগানটি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করে। এই রূপান্তরটি স্থানীয় মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেনমার্কের ন্যাটো মিত্র দেশগুলোর সমর্থনে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির বিরোধে একটি দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো ইতিমধ্যে কোপেনহেগেনের সমর্থনে গ্রিনল্যান্ডে সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা যায়।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো সরাসরি মন্তব্য না থাকলেও, সামাজিক মিডিয়ায় তিনি একটি গ্রাফিক পোস্ট করেছেন। ছবিতে ট্রাম্প মার্কিন পতাকায় হাতে গ্রিনল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছেন, তার পেছনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত। ছবির সামনে একটি কাঠের বোর্ডে “গ্রিনল্যান্ড—আমেরিকার অংশ” এবং “প্রতিষ্ঠা ২০২৬” লেখা রয়েছে।
এই পোস্টের মাধ্যমে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ২০২৬ সালে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ হয়ে যাবে। পোস্টটি নিউ ইয়র্ক টাইমস, এপিএইচ এবং গ্লোবাল নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই দাবি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে ডেনমার্কের সরকারী নীতি এবং ন্যাটো জোটের অবস্থানকে কেন্দ্র করে।
ডেনমার্ক সরকার গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান করে এবং কোনো একতরফা ভূখণ্ড পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে। তবে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কিছুই স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি সমর্থন করেনি। বরং, বেশিরভাগ দেশ গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সমাধান খোঁজার পক্ষে।
প্রতিবাদকারীরা টুপি ব্যবহারকে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সম্প্রসারণের নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা দাবি করে যে গ্রিনল্যান্ডের জনগণকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে এবং কোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপে তাদের স্বায়ত্তশাসন হুমকির মুখে পড়বে।
ট্রাম্পের লাল টুপি, যা এক সময়ে আমেরিকান জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিল, এখন ইউরোপে একটি বিরোধী চিহ্নে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতীকী উপকরণের ভূমিকা কতটা পরিবর্তনশীল হতে পারে তা প্রকাশ করে।
এই ঘটনার পর, ডেনমার্কের পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য অতিরিক্ত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু সদস্য গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের সম্ভাবনা উত্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তার সমর্থকরা দাবি করে যে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয়, তবে বিরোধীরা এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়া সংস্থা এই বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা আলোচনা করা হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। ডেনমার্ক ও ন্যাটো জোটের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এবং স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা একসঙ্গে গঠন করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা এবং জাতীয় স্বার্থের টানাপোড়েনকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে। ট্রাম্পের লাল টুপি, যা এক সময়ে আমেরিকান ভোটারদের উত্সাহের প্রতীক ছিল, এখন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে প্রতিবাদকারীদের হাতে নতুন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে।



