সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স (SDF) আল-হোল শিবির থেকে সরে গিয়ে অন্য শহরে পুনর্বিন্যাস করেছে। শিবিরে হাজারো পরিবার IS-সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগের মুখে বসবাস করছিল। এই পদক্ষেপটি দুই সপ্তাহের গৃহযুদ্ধের মাঝখানে, বিদ্যমান সশস্ত্র বিরোধের মাঝেও নেওয়া হয়েছে।
SDF জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা তাদেরকে শিবির ত্যাগে বাধ্য করেছে এবং তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য উত্তরের শহরে রওনা হয়েছে। শিবিরের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া তাদের কূটনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় এই পদক্ষেপকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে এবং উল্লেখ করেছে যে শিবির ত্যাগ কোনো সরকারী বা যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোটের সমন্বয় ছাড়া ঘটেছে। মন্ত্রণালয় দাবি করে যে এই ধরনের একতরফা কাজ সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।
একই সময়ে শাদ্দাদি কারাগার থেকে সন্দেহভাজন IS যোদ্ধারা পালিয়ে যায়, যা সরকারী বাহিনীর সঙ্গে SDF-র সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে। শাদ্দাদি কারাগার SDF-র নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবে গুলিবিদ্ধের ফলে নিরাপত্তা ভেঙে যায়।
অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় জানায় যে সোমবার ১২০ বন্দি শাদ্দাদি কারাগার থেকে পলায়ন করে, যার মধ্যে ৮১ জনকে সৈন্য ও পুলিশ পুনরায় গ্রেফতার করেছে। বাকি বন্দিদের অবস্থান এখনও অনিশ্চিত।
SDF দাবি করে যে সরকারী বাহিনী শাদ্দাদি কারাগার হারানোর পর প্রায় ১,৫০০ বন্দি মুক্ত করেছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষয়কে নির্দেশ করে। এই সংখ্যা সরকারী সূত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে না, তবে সংঘাতের তীব্রতা স্পষ্ট করে।
রাক্কা নিকটবর্তী আল-আকতান কারাগারেও বোমা হামলা হয়েছে, যার ফলে জলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কারাগারের শর্তাবলী দ্রুত অবনতি হচ্ছে, যা বন্দিদের মানবিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
রবিবারের মধ্যাহ্নে মিলিশিয়া জোট একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছায়, যেখানে কুর্দি-নেতৃত্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি সরকারকে হস্তান্তর করা হবে। চুক্তির আওতায় সরকারকে অঞ্চলটির কারাগার ও শিবিরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে।
চুক্তির আরেকটি মূল ধারা হল SDF-র দশ হাজারেরও বেশি যোদ্ধা রাক্কা ও দেইর আল-জুর প্রদেশ থেকে হ্যাসাক্কা প্রান্তিক অঞ্চলে প্রত্যাহার করবে এবং পরবর্তীতে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একীভূত হবে। এই পদক্ষেপটি স্বায়ত্তশাসনের শেষের সূচক হিসেবে বিবেচিত।
SDF-র জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি সংখ্যালঘুর স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে সংগ্রাম করেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জোটের সহায়তায় IS-কে পরাজিত করার পর। এখন তারা রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে ফেলছে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারায়া, যিনি ডিসেম্বর ২০২৪-এ বশার আল-আসাদকে উখণ্ডনকারী বিদ্রোহী শক্তির নেতৃত্বে দেশকে পুনরায় একীভূত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার নীতি এখন বাস্তবায়নের পথে। তবে সিরিয়ার অভ্যন্তরে ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাতের তরঙ্গ এখনও অব্যাহত, যা পুনর্মিলনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক গঠনের একটি নতুন মোড় হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের IS-বিরোধী জোটের ভূমিকা কমে যাওয়ায় সিরিয়ার সরকারকে আরও স্বায়ত্তশাসিত গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করতে হচ্ছে।
একজন বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “এই চুক্তি সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের তীব্রতা কমাতে পারে, তবে কুর্দি গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্নকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা গ্যারান্টি ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে হতে পারে।
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রাক্কা ও দেইর আল-জুরের কৌশলগত অবস্থান এখন সরকারী নিয়ন্ত্রণে ফিরে এসেছে, যা উত্তর-পূর্বে সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল সীমিত করবে। হ্যাসাক্কা অঞ্চলে SDF-র সংহতি ও প্রশিক্ষণ নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হবে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সরকার ও SDF-র মধ্যে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সূচি নির্ধারিত হবে, যার মধ্যে অস্ত্র সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও মানবিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার রক্ষার দিকে নজর রাখবে।
সারসংক্ষেপে, কুর্দি-নেতৃত্বাধীন SDF আল-হোল শিবির ত্যাগের মাধ্যমে সিরিয়ার সরকারকে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনছে, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আনবে এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন পরিকল্পনার ভিত্তি স্থাপন করবে।



