সাভার মডেল থানা অপারেশনস ইনস্পেক্টর মো. হেলাল উদ্দিন গতকাল জানিয়েছেন যে, গত সাত মাসে ছয়জনের মৃত্যু ঘটানো সন্দেহভাজনের প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে মানসিক অস্বাভাবিক বলে সন্দেহ করলেও, পুলিশ জানিয়েছে তিনি মানসিক রোগের ভান করে বহু ছদ্মনাম ব্যবহার করছিলেন, যার মধ্যে মাশিউর রহমান সম্রাট ও টিগার সম্রাট অন্তর্ভুক্ত।
সাবুজের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, তিনি ওই এলাকায় “মানসিক অস্বাভাবিক” বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বসবাস রোধের জন্যই হত্যাকাণ্ড করেছেন। তবে হেলাল ইনস্পেক্টর এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন এবং আরও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাবুজ স্বীকার করেন যে, তিনি ছয়জনের মৃত্যু ঘটিয়েছেন, যার মধ্যে সর্বশেষে একটি দ্বিগুণ হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত। তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, আঙুলের ছাপের ডাটাবেসে তার কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি এবং পূর্বের অপরাধের কোনো নথি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সাবুজ প্রায়ই পুলিশকে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে ফোন করতেন। হেলাল ইনস্পেক্টর জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি সাবুজের কল পেয়ে জানেন যে, তিনি সিআইডি, পিবিআই ও সাভার থানাকে দুইটি দেহ উদ্ধার করতে অনুরোধ করেছেন। ইনস্পেক্টর কলটি কাটিয়ে দেন এবং পরে রাত ১২:১৫ টায় সাভার পৌরসভা কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে যান।
সেই সময় তিনি দ্বিতীয় তলায় একটি কম্বল দিয়ে ঢাকা নারীকে দেখতে পান, যাকে পরে তানিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সময়ে সন্দেহভাজন সাবুজ কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তার ব্যাগ থেকে দুইটি তালিকা বের হয়, যেখানে শের-ই-বাংলা নগর থানা ও সাভার মডেল থানার কর্মকর্তাদের নাম ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ ছিল।
ইনস্পেক্টর তালিকাগুলো ছিঁড়ে ফেলেন, কয়েক ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন এবং প্রায় রাত ৩ টায়现场 ত্যাগ করেন। প্রায় ৩৫ ঘণ্টা পর একই ভবন থেকে দুটো পুড়িয়ে দেওয়া দেহ উদ্ধার করা যায়।
সিবিসিটিভি ফুটেজে সাবুজকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, যা তাকে গ্রেফতার করার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি স্বীকার করেন যে, ৪ জুলাই ২০২৫ থেকে ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যু ঘটিয়েছেন।
অপরাধের সময়সীমা ও পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য তদন্ত দল অতিরিক্ত সাক্ষী ও ডেটা বিশ্লেষণ করছে। বর্তমানে পাঁচটি দেহই পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, আর বাকি দেহের অবস্থান ও পরিচয় নির্ধারণে কাজ চলছে।
সাবুজের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের পর, মামলাটি সাভার থানা থেকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ফৌজদারি আদালতে পাঠানো হবে। আদালতে তার বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
পুলিশের মতে, সন্দেহভাজনের ছদ্মনাম ও পরিচয় গোপন করার পদ্ধতি তদন্তের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি যে তালিকাগুলো বহন করছিলেন, তাতে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ও ফোন নম্বর ছিল, যা তার পরিকল্পনা ও যোগাযোগের পদ্ধতি সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।
অধিক তদন্তে জানা যাবে, কীভাবে তিনি এই ছদ্মনামগুলো ব্যবহার করে অপরাধের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করছিলেন এবং তার পেছনের প্রেরণা কী। এছাড়া, তার মানসিক অবস্থা ও সম্ভাব্য মানসিক রোগের প্রকৃত স্বরূপ নির্ণয়ের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে।
সাভার এলাকার বাসিন্দারা এই ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এলাকায় অতিরিক্ত পেট্রোল ও নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
সাবুজের গ্রেফতার ও স্বীকারোক্তি সাভার অঞ্চলে দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক উদ্বেগকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দিচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



